Friday, 19 December 2025

বাংলাদেশের ভারত বিরোধিতা: আবেগ না রাষ্ট্রবুদ্ধি?

বাংলাদেশের ভারত বিরোধিতা: আবেগ না রাষ্ট্রবুদ্ধি?

✍️ রূপেশ কুমার সামন্ত 

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে সাম্প্রতিক কালে ভারত–বিরোধিতা নতুন করে জোরালো হয়েছে। রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে সামাজিক মাধ্যম—সবখানেই এক ধরনের শ্লোগানধর্মী বিরোধিতা চোখে পড়ে। প্রশ্ন ওঠে, এই বিরোধিতা কি বাস্তব অভিজ্ঞতা ও যুক্তির ফল, নাকি এটি একটি সচেতনভাবে নির্মিত রাজনৈতিক আবেগ?

ইতিহাস মনে করালে অস্বস্তি তৈরি হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের ভূমিকা কেবল কূটনৈতিক সমর্থনে সীমাবদ্ধ ছিল না—তা ছিল অস্তিত্বের প্রশ্নে সহযাত্রা। কিন্তু ইতিহাস রাজনৈতিক স্মৃতির চেয়েও দ্রুত ম্লান হয়, যখন বর্তমানের সংকট তার জায়গা দখল করে। আজকের প্রজন্মের কাছে ১৯৭১ একটি অধ্যায়, আর আজকের মূল্যবোধ গঠিত হচ্ছে সমসাময়িক রাজনৈতিক ভাষ্যে।

এই ভাষ্য নির্মাণেই ভারত–বিরোধিতা একটি সুবিধাজনক হাতিয়ার।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যখন অর্থনৈতিক চাপ বাড়ে, কর্মসংস্থানের প্রশ্ন তীব্র হয়, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়—তখন জনরোষকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া একটি পরিচিত কৌশল। সেই কৌশলে “বাইরের শত্রু” সবসময় কার্যকর। আর ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক কারণে ভারত সেই শত্রু রূপে সহজেই চিহ্নিত করা যায়।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য করা জরুরি। ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের কিছু বাস্তব সমস্যা আছে—জলবণ্টন, সীমান্তে প্রাণহানির অভিযোগ, বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা। এগুলি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সমস্যাগুলি কি কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের অযোগ্য? নাকি এগুলিকে ইচ্ছাকৃতভাবে জাতীয় অপমানের বয়ানে রূপান্তরিত করা হচ্ছে?

সমস্যা ও শত্রুতার মধ্যে পার্থক্য না করলে কূটনীতি রাজনীতির বলি হয়।

আরও উদ্বেগজনক হলো, ভারত–বিরোধিতাকে ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার প্রবণতা। “হিন্দু ভারত বনাম মুসলিম বাংলাদেশ”—এই সরলীকৃত বিভাজন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, কিন্তু আবেগ তৈরিতে অত্যন্ত কার্যকর। এই ভাষ্য ব্যবহার করে কিছু রাজনৈতিক ও ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠী নিজেদের সমর্থনভিত্তি বিস্তৃত করতে চায়। ফলত, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে জটিল কূটনৈতিক সম্পর্ক একটি সংকীর্ণ পরিচয় রাজনীতির শিকার হয়।

এই বিরোধিতার অন্তরালে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির দিকটিও উপেক্ষা করা যায় না। দক্ষিণ এশিয়া আজ বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র। ভারত মহাসাগর অঞ্চল, বাণিজ্যপথ, সামরিক প্রভাব—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ একটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশ। এই প্রেক্ষাপটে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক দুর্বল হলে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন আসে। ফলে ভারত–বিরোধী আবহ অনেক সময় পরোক্ষভাবে উৎসাহিত হয়—প্রচার, বিভ্রান্তিকর তথ্য ও রাজনৈতিক বয়ানের মাধ্যমে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই খেলায় লাভবান হচ্ছে কে?

ভারত বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রতিবেশী, প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের অন্যতম, জ্বালানি ও অবকাঠামো সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গী। নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতাও দুই দেশের জন্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই বাস্তবতা উপেক্ষা করে আবেগনির্ভর বিরোধিতা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের স্বার্থকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।

রাষ্ট্র পরিচালনায় আবেগ নয়, হিসাব জরুরি।

ভারত–বিরোধিতা যদি জনমনে ক্ষোভের ভাষা হয়ে ওঠে, তবে তা গণতান্ত্রিক সমাজের পক্ষে বিপজ্জনক। কারণ তখন প্রকৃত প্রশ্নগুলি—দুর্নীতি, প্রশাসনিক জবাবদিহি, অর্থনৈতিক ন্যায়—পিছনের সারিতে চলে যায়। শত্রু নির্মাণ সহজ, সমাধান নির্মাণ কঠিন।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে একটি পরিণত সিদ্ধান্তের ওপর। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই মতপার্থক্যকে শত্রুতায় রূপ দেওয়া রাষ্ট্রবুদ্ধির পরিচয় নয়। কূটনীতি দাবি করে সংলাপ, বাস্তববাদ ও স্বার্থের হিসাব।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—
বাংলাদেশ কি আবেগ দিয়ে রাজনীতি করবে, নাকি স্বার্থ দিয়ে রাষ্ট্র গড়বে?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ, এবং তার সঙ্গে বাংলাদেশের নিজস্ব রাজনৈতিক পরিণতিও।

বাংলাদেশের ভারত বিরোধিতা: আবেগ না রাষ্ট্রবুদ্ধি?

বাংলাদেশের ভারত বিরোধিতা: আবেগ না রাষ্ট্রবুদ্ধি? ✍️ রূপেশ কুমার সামন্ত  বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে সাম্প্রতিক কালে ভা...