Showing posts with label Story. Show all posts
Showing posts with label Story. Show all posts

Friday, 11 April 2025

শাঁখা সিঁদুর (ছোট গল্প)

 ---আমার আবার বিয়ে হবে!

হোয়াটসঅ্যাপে রাসমনির এমন মেসেজ দেখেই চমকে উঠলো নিঝুম। বিবাহিতা বান্ধবীর এমন মেসেজ দেখে স্বভাবতই কিছুটা উদ্বিগ্নও দেখাল নিঝুমকে। এরপরই রাসমনিকে একের পর এক মেসেজ করতে থাকে নিঝুম, 'কেন? কি হল আবার? কার সাথে বিয়ে?'

এমন হাজার প্রশ্ন পরপর করতে থাকল নিঝুম। ওদিকে রাসমনি শুধু একটি করে হাসির ইমোজি পাঠায় আর চুপ করে যায়! কোন উত্তর আর দেয় না। শুধুই হাসির ইমোজি!

নিঝুম এবার রাগ দেখিয়ে বলল, 'এত টেনশন দিস কেন? কি হয়েছে বল আগে'।

এবার রাসমনি বলল, 'নেক্সট সান ডে আমার বাড়ি চলে আয়।  চুটিয়ে আড্ডা দেওয়া যাবে। সব কথা হবে'।


রবিবারের দুপুরে রাসমনির বাড়ি পৌঁছে গেল নিঝুম। প্রথমেই ছুটে এল রাসমনির ছেলে কৃতি। নিঝুমের কাছে গিয়ে বলল, 'হাউ আর ইউ আঙ্কেল?’

---ওয়েল। হাউ আর ইউ?

---নাইস। প্লিজ কাম ইন।

সামনে রাসমনিকে দেখে নিঝুম বলল, 'তোর ছেলে তো বেশ ইংলিশ বলে! কোন ক্লাস হল?'

রাসমনি বলল, 'এই ক্লাস এইট। সারাক্ষণ ইংলিশ কার্টুন দেখে ঐসব শিখেছে! আমাকে তো সারাক্ষণ জ্বালিয়ে খায়'!

---আর কাকে জ্বালাবে? তুইই ওর বাবা, তুইই ওর মা। সেই কবে ওর বাবা ছেড়ে চলে গেছে! বাবা কি জিনিস ছেলেটা জানলোই না!

---হুম

কৌতুহলী হয়ে নিঝুম জিজ্ঞাসা করে, 'এখন বাবাকে খুঁজে নাকি?'

---না। আর না খুঁজুক, সেটাই চাই। বাবার মতো ছেলেটা হোক, চাই না।

--- ওর বাবা আর খোঁজ নেয় না?

রাসমনির দুচোখে রাগ ঝরে পড়ল। ক্ষুব্ধস্বরে বলল, 'বিশ্বাসঘাতক! যোগাযোগের চেষ্টা করে। আবার ফিরতে চায়। কিন্তু আমি আর চাই না। যে মানুষটা অন্য নারীতে সুখ খুঁজে চলে গেছে; নিজের সন্তান-পরিবারের কথা এক বিন্দু ভাবল না, তাকে আর বিশ্বাস করতে চাই না'।

---নতুন করে তো আবার সংসার বাঁধতে পারতিস!

---না রে! এই তো আমার সুখের সংসার। মা-ছেলের সুখের নীড়। আমি যে টুকু রোজগার করি, তাতেই সন্তুষ্ট। বেশ চলে যায় মা-ছেলের সংসার। আর কোন সুখের দরকার নেই।

আবারও কৌতুহলী হয়ে নিঝুম জিজ্ঞাসা করল, 'ডিভোর্সটা কি তোদের হয়ে গেছে? শাঁখা-সিঁদুর তো পরে আছিস! আবার বিয়ে করবি বলছিস তাহলে কেন? ব্যাপার কি?'

---পাগল বটে তুই!

---কেন?

এবার হাসতে হাসতে রাসমনি বলল, 'আরে আমার ছেলে বলছে, মা তূমি আমার কিউট গার্ল ফ্রেন্ড! তোমাকেই বিয়ে করব! আমার মনে হল, ছেলের কথাটা তোর সাথে শেয়ার করি! তাই তোকে পাঠালাম'।

---আরে আমি তো অবাক হয়ে গিয়ে ছিলাম! ভাবলাম সত্যিই বিয়ে নাকি!

গম্ভীর হয়ে রাসমনি বলল, 'নাহ! আর বিয়ে করার কোন ইচ্ছেই নেই। নতুন করে কাউকে আর বাঁধতে চাই না। বাঁধা পড়তেও চাই না। মায়া আর মোহে নিজেকে আর হারিয়ে ফেলতে চাই না। নিজের পৃথিবীতে নিজেকে ভালবাসতে চাই। নতুন করে গড়তে চাই'। 

-এখনো তো দিব্যি শাঁখা-সিঁদুর পরে আছিস? ডিভোর্স কি হয়নি তোদের?

- আর ডিভোর্স! মনের ডিভোর্স তো অনেক দিনই হয়ে গেছে। কাগুজে ডিভোর্সের আর কি মূল্য আছে? সেই সম্পর্ক আমার কাছে আজ মৃত।

নিঝুম ইতস্তত করতে করতে বলল, 'তাহলে এই শাঁখা-সিঁদুর কার জন্য?'

রাসমনির চোখের কোনে জল। ভারাক্রান্ত গলায় বলল, 'এই শাঁখা-সিঁদুর স্বামীর জন্যও নয়, অন্য কারুর জন্যও নয়। এই সমাজের জন্য। চারিদিকে শুধু লোভ আর লালসার মায়াজাল! এই সমাজে একজন স্বামীহীন মেয়ের বেঁচে থাকার লড়াই খুব কঠিন। আমি সঙ্গীহীন নারীর রূপটা  সমাজকে দেখাতে চাই না। তাছাড়া আমার নি:সঙ্গ জীবনের দুর্বলতার চোরাগলিতে কেউ প্রবেশ করে মা-ছেলের সুন্দর পৃথিবীটা এলোমেলো করে দিক, সেটাও আমি চাই না। এই শাঁখা-সিঁদুরই বিষময় সমাজে আমার সুরক্ষা বলয়'। 


শাঁখা সিন্দুর (ছোট গল্প) © রূপেশ কুমার সামন্ত

Monday, 26 August 2024

সুখ (ছোট গল্প)


 প্রতিদিন সকালে পার্কে হাঁটতে আসেন পলাশ। পেশায় ব্যাঙ্কের অফিসার। সবসময় হাসিমুখ। বেশ নম্র-ভদ্র ব্যবহার। সবার সাথে মিষ্টি করে হেসে কথা বলেন। বাড়ি ফেরার সময় নির্দিষ্ট একটি ফুলের দোকান থেকে এক গোছা ফুল কিনে নিয়ে যান। ফুলের দোকানটি ৩০-৩৫ বছরের একটি মেয়ে চালায়।  মেয়েটির নামেই দোকান- 'পিয়ালি ফ্লাওয়ার্স'। দেখেই বোঝা যায় মেয়েটি স্বামীহারা। দোকানে মাঝে মাঝে সাহায্য করে মেয়েটির একমাত্র কন্যা। তাঁর বয়স বছর পনেরো হবে। প্রতিদিন দোকানে গিয়ে পলাশ সৌজন্যবশত বলেন, 'ভালো আছেন?' আবার ফুল নেওয়ার শেষে টাকা মিটিয়ে বলেন, 'ধন্যবাদ'। কিন্তু দোকানদার পিয়ালি প্রতি-সৌজন্যবশত কখনোই ধন্যবাদ জানান না। উলটে মুখের এমনই বিকৃতি করেন যে, পলাশের এই প্রাত্যহিক সৌজন্য জ্ঞাপনে তিনি বিরক্ত। 

কিন্তু অবাক বিষয়, দিনের পর দিন পলাশ এই সৌজন্যবোধটুকু বজায় রেখে চলেছেন। প্রতিদিনই দোকানে গিয়েই পলাশ সেই একই কথা বলেন, 'ভালো আছেন?' ফেরার সময় 'ধন্যবাদ' বলতেও ভুলেন না। বিষয়টি ভালো ভাবেই পর্যবেক্ষণ করেছে দোকানদারের মেয়ে। সে মাকে বলে, 'আমার সাথে কেউ এমন রূঢ় ব্যবহার করলে আমি দ্বিতীয়বার সৌজন্যের ধার ধারতাম না! পলাশ আঙ্কেল অনেক ভালো বলেই আমাদের দোকানে আসে। একটু ভালো ব্যবহার করতে পারো না?'

জ্বলে উঠল পিয়ালি। রাগে গরগর করতে করতে বলল, 'পুরুষ জাতিকে আমার চিনতে বাকি নেই! কোথাও মেয়ে দেখলেই…'

কথা থামিয়ে দিয়ে পিয়ালির মেয়ে বলে, 'বাবা তোমাকে ছেড়ে চলে গেছে বলেই কি সব পুরুষ মানুষ খারাপ?'

-'নাহ! আমিই খারাপ! তাই তো তোর বাবাও ছেড়ে দিয়েছে আমায়', বলেই কাঁদতে শুরু করে পিয়ালি। আর কথা বাড়ায় না মেয়ে।

কয়েক বছর পর বিয়ে হয়ে যায় পিয়ালির মেয়ের। এখন দোকান একা সামলায় পিয়ালি। পলাশ সেই আগের মতোই রোজ সকালে পিয়ালির দোকানে আসে। আর এক গোছা করে ফুল কিনে নিয়ে যায়। এখনো আগের মতোই রোজ আসা যাওয়ার সময় সেই সোজন্য দেখাতে ভোলেন না। আর পিয়ালির বিরক্তি প্রকাশটাও সেই একই ভাবে চলতে থাকে।

একদিন সকালে পিয়ালি দোকানের চেয়ারটায় হেলান দিয়ে বসে আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে অত্যন্ত অসুস্থ ও অবসন্ন। ফুল কিনতে গিয়ে পলাশ প্রতিদিনের মতোই বললে, 'ভালো আছেন?'

ধীরে ধীরে চোখ মেলে পিয়ালি বলল, 'ভালো নেই'।

পিয়ালি বলল, 'কদিন ধরেই বুকটা খুব যন্ত্রনা করছে। শ্বাস নিতে পারছি না। মাথার যন্ত্রনা হচ্ছে। খুব ঘাম দিয়ে যাচ্ছে'।

পলাশ জিজ্ঞাসা করল, 'মেয়েকে জানিয়েছেন?'

পিয়ালির চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে এল। অস্ফুট কণ্ঠে বলল, 'মেয়েটাও আর যোগাযোগ রাখে না। সবাই ছেড়ে চলে গেছে'।

পলাশ আস্বস্ত করে বলল, 'চিন্তা করবেন না। আমি তো আছি। চলুন, এখন হাসপাতালে নিয়ে যাই'।

এরপর পলাশ তদারকি করে পিয়ালিকে হাসপাতালে ভর্তি করল। কিছু দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠল পিয়ালি। আবার দোকানদারি শুরু করল। পলাশ প্রতিদিনের মতোই দোকানে ফুল কিনতে বলল, ‘ভালো আছেন'?

পিয়ালি একরাশ কৃতজ্ঞতা ভরে বলল, 'আপনি না থাকলে বোধহয় এই ভালো থাকাটা আর হত না। আচ্ছা, একটা কথা জিজ্ঞাসা করব?'

পলাশ বলল, 'অবশ্যই'।

পিয়ালি বলল, “আচ্ছা আপনার সাথে এত অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছি। বিরক্তি দেখিয়েছি। তবুও মিষ্টি ব্যবহার করেছেন। বিপদে পাশে থেকেছেন। কেন বলুন তো?'

পলাশ একগাল হেসে বললেন, “সৌজন্য, ভালবাসা - এই দুইটি জিনিস একান্ত ভাবে আমার নিজের। আমি কারুর হাতে যেমন আমার সৌজন্য-ভালবাসা ছেড়ে দিই না, তেমনি কারুর দ্বারা প্রভাবিত হয়েও বদলে ফেলি না।  আমি তাই সবার সাথে সমানভাবে হাসিমুখে সৌজন্য দেখিয়ে যাই, সমান ভালবাসা দিয়ে যাই। মানুষটি প্রতিদানে কী দিল, সেটি আমার কাছে মুখ্য নয়।  তাই মনের গভীরে গভীর সুখ অনুভব করতে পারি। তাই বোধহয় আমি খুব সুখীও বটে!'

 


Sunday, 6 October 2019

Bengali Story- গল্প- মা দুগ্গা, একটাই বর দ্যাও দেকিনি!

-----মা দুগ্গা, একটাই বর দ্যাও দেকিনি!-----
[একটি মজার গল্প] @রূপেশ সামন্ত

     ‘মা দুর্গা, আমার একটা রিকোয়েস্ট ছিল! সারা বছর স্মার্ট ফোনে সেলফি তুলেছি, গেম খেলেছি। তুমি তো সবই জানো, মা। এবারের মতো উচ্চমাধ্যমিকটা পাশ করিয়ে দাও। কথা দিচ্ছি, আর স্মার্টফোন ঘাঁটব না। এই আমি শপথ করছি, আর জীবনে ফোন ছোঁবই না!’ গভীর রাতে মণ্ডপে মা দুর্গাকে একা পেয়ে অম্বর তার প্রার্থণাটা সেরে ফেলল।
      ‘তোর কোন চিন্তা নেই, তুই পরীক্ষায় পাশ করে যাবি’, মা দুর্গা বর দিলেন।
      ‘ম্যাডাম, আপনি কথাও বলেন? বা! বা! ঠিক আছে আমার প্রেয়ারটা সাকসেসফুল হলেই আমি একটা ঝক্কাস স্মার্টফোন গিফট দিয়ে যাবো!’ কথা গুলো বলেই অম্বর মা দুর্গার সঙ্গে একটা সেলফি তুলেই মণ্ডপ ত্যাগ করল।
      এরপর প্রীতিকা এদিক ওদিক তাকিয়ে ফাঁকা মণ্ডপে টুক করে ঢুকে পড়ল; আর প্রার্থণাটা সেরেই ফেলল, ‘সবাই বলে আমি সুন্দর দেখতে! আমার পেছনে ছেলেরা ঘুর ঘুর করে। আর আমিও একট-আধটু...থাক, মা, সবই তো জানো! পড়াশোনাটাই করিনি। কোন রকমে উচ্চমাধ্যমিক পাশ। একটা ফার্স্টক্লাস, হ্যান্ডসাম হাজব্যান্ড দিয়ে দাও মা!’
      ‘তোর কোন চিন্তা নেই, তুই ফার্স্টক্লাস, হ্যান্ডসাম হাজব্যান্ড পাবি’, মা দুর্গা বর দিলেন।
এরপর ভবানী প্রসাদ বাবু মণ্ডপে ঢুকলেন। ভাগাড়ের মাংসের কারবার। মা দুর্গার কাছে প্রার্থণা করলেন, ‘ভাগাড়ে যেন রোজ রোজ পশুর ডেডবডি পড়ে। আমি যেন আরো আরো ব্যাংক ব্যালেন্স পারি!’
      ‘তোর কোন চিন্তা নেই, তুই প্রচুর রোজগার করবি’, মা দুর্গা বর দিলেন। এর কিছুক্ষন পর ফাঁকা মণ্ডপে ঢুকলেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি পিকলু’দা। সাথে পার্সোনাল এ্যাসিস্টেন্ট রাজা। এই পুজা কমিটির সভাপতিও পিকলু’দা। ‘মা, তুমি তো সবই জানো! পাবলিককে ধমকে চমকে এতো বড় পূজা করছি। শুধু তোমাকেই খুশি করতে। সামনেই ইলেকশন। সারা বছর যা করেছি, ভোট হলে কেউ ভোট দেবে না। এবারের মতো ইলেকশনটা উতরে দাও, মা!’
      ‘তোর কোন চিন্তা নেই, তুই ইলেকশনে জিতবি’, মা দুর্গা বর দিলেন।
      ‘পিকলুদা, মা প্রেয়ার গ্র্যান্ট করে দিয়েছে। তাহলে রবীনকে একটু কেলিয়ে আসি! খুব আমাদের বিরুদ্ধে গলার শির ফুলিয়ে স্লোগান দেয়!’ রাজা বলল।
      ‘ওটা দশমীতে তোলা থাক!’ বলেই পিকলু’দা বেরিয়ে গেল।
      ‘মা, রঙ চেঞ্জ করে আমি এদিকে এসেছি। হরিলুটের প্রচুর বাতাসাও কুড়িয়েছি! লিডারদের পাশে থাকলে যা হয় আর কি! লাভের গুড় পিঁপড়েতে যেন না খায়, মা!’ রাজাও প্রার্থণাটা সেরে ফেলল।
      ‘তোর কোন চিন্তা নেই, তোর টাকা তোরই কাজে আসবে’, মা দুর্গা বর দিলেন।
       এরপর স্বর্ণ মণ্ডপে প্রবেশ করল। বিবাহিত পুরুষ। মা দুর্গার কাছে ফিসফিস করে বলল, ‘আমি একটু-আধটু পরকিয়া করছি! যদিও পরকিয়ার পক্ষে আইন পাশ রয়েছে, তবুও সব যেন গোপন থাকে।’
‘তোর কোন চিন্তা নেই, তোর পরকিয়া গোপন থাকবে’, মা দুর্গা বর দিলেন। /লেখক- রূপেশ সামন্ত

      ‘যার যেটা পাওয়ার কথা নয়, অযোগ্যরা সেটা পেয়ে গেলে তো আর কেউ আমাদের রেসপেক্ট করবে না; পৃথিবীতে ভারসাম্যও থাকবে না!’ পাশ থেকে মা দুর্গার ছেলে-মেয়ে গনেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী ও সরস্বতী অভিযোগ করল।
      মা দুর্গা বললেন, ‘আমার উপর ভরসা রাখ! এরা তো মানুষ! এদের বেশির ভাগই লোভী! সহনশীল নয়! নিজেদের যোগ্যতার বেশি চায়! নিজে থেকে শেখে না! ঠেকে শেখে! আমি তো জগজ্জননী! সকলের মা! আমি ঠিক শিখিয়ে পড়িয়ে মানুষ করে দেব।’
      এইভাবে কেটে গেল তিন বছর। মা দুর্গার বর সকলের উপর কার্যকরী হয়েছে। প্রায় সকলেই একসঙ্গে দুর্গা মায়ের মণ্ডপে হাজির। কিন্তু পরিস্থিতি এখন ভিন্ন। /লেখক- রূপেশ সামন্ত
      অম্বর বর পেয়ে উচ্চমাধ্যমিকে স্টার পেয়েছে। কলেজে ইংরাজি অনার্সে ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু যোগ্যতায় কুলোয় নি। যথারীতি ফেল করেছে। মার্কশিটের ওজনে ভারাক্রান্ত হয়ে মালবাহকের কাজটাও করতে পারলো না!
      আর প্রীতিকা ফার্স্টক্লাস হ্যান্ডসাম বর পেয়েছিল। কিন্তু যোগ্যতা ও মানসিক দূরত্বের ফারাক এতো বেশি ছিল যে, বিয়ের দু'বছরের মধ্যে ডিভোর্স হয়ে গেছে।
      এদিকে ভবানী প্রসাদ বাবুর সস্তা ভাগাড়ের মাংসের ঠেলায় পুরো বাজারটাই ভাগাড়ের মাংসে ভরে গেল। বিষক্রিয়ায় বহু মানুষের মৃত্যু হল। ভবানী প্রসাদের জেল হল। কিন্তু পুলিশের হাত থেকে ছিনতাই হয়ে গিয়ে গনপ্রহারেই তার মৃত্যু হল।
      অন্যদিকে পিকলু'দা ভোটে জিতল। কিন্তু জনসমর্থন নেই। ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ পিকলু'দার জনরোষেই মৃত্যু হল।
      আবার রাজার উপরও আছড়ে পড়ে গনপ্রহার। হাত-পা খুইয়ে পথের ধারে ভিক্ষা করে। তার চিকিৎসাতেই 'হরিলুটের বাতাসা' সব শেষ!
      স্বর্ণের পরকিয়া প্রেম জমেছে। তবে স্বর্ণের দ্বারা মানসিক নির্যাতনে বিতশ্রদ্ধ হয়ে ও ভালবাসা না পেয়ে তার স্ত্রীও পরকিয়া সম্পর্কে আবদ্ধ হয়েছে। বিষয়টি জানতে পেরে স্বর্ণ স্ত্রীকে হারানোর ভয়ে আবার উন্মাদের মতো স্ত্রীকে ভালবাসতে শুরু করেছে।
 

      ‘আমাদের সব পাপ মুক্ত করো মা! আমরা আমাদের ভূল বুঝতে পেরেছি। লক্ষ্মণরেখা কখনোই পেরোন উচিৎ নয়।’ একযোগে সকলে বলল।

      এবার নড়েচড়ে উঠলেন মহিষাসুর। খুব ম্রিয়মান গলায় বললেন, ‘মা দুগ্গা, একটাই বর দ্যাও দেকিনি! এরা আমাকে দেকেও শিকেনি! বেশি বাড়াবাড়ি না করলে কি আমাকে এইভাবে ত্রিশুল বিদ্ধ হয়ে পড়ে থাকতে হোত!’
      ‘কি বর দেব?’ মা দুর্গা বললেন।
মহিষাসুর বললেন, ‘শুধু একটা আয়না দাও। তাতে শুধু নিজের বাইরেটা নয়, ভিতরটাও যেন দে্ষা যায়!’

লেখক- রূপেশ সামন্ত/ 06.10.18.


Monday, 1 April 2019

ছোট গল্প- শ্লেট


শ্লেট

[প্রকাশিত- নীল আকাশের খাতা]

 লেখক- রূপেশ কুমার সামন্ত


          'চা এর এই গরম জলই আজ গায়ে ঢালব! একবার ঘুম থেকে উঠুক! ছেলেটা কি আমার একার নাকি! আজ আমি আর গার্ডিয়ান মিটিংয়ে যাচ্ছি না!' স্বগতোক্তি করতে করতে রাগে টগবগ করে ফুটছিল দিদিমনি। সকাল বেলায় গ্যাস ওভেনে চা'য়ের জন্য জলটাও ফুটছিল টগবগ করে। দিদিমনির নাম মেঘা রায়। স্বামীও শিক্ষক। নাম সুতনু রায়। শিক্ষক দম্পতি শহরের একটি ফ্ল্যাটে থাকেন। তাদের একটি ছয় বছরের ছেলেও রয়েছে। সে বিগত দু'বছর ধরে স্কুলে যাচ্ছে। সে একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ক্লাস ওয়ানে পড়েগতকাল রেজাল্ট আউট হয়েছে। আজ অভিভাবক সাক্ষাতে ছাত্রদের খাতা দেখানো হবে।
         রান্নাঘরের পাশের রুমে তখনও শুয়ে আছে সুতনু। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবলেন, আজ আর চা খাওয়া হল না!
         চুপি চুপি উঠলেন সুতনু বাবু। মনে মনে ভাবলেন, গৃহশান্তি আগে! প্রাপ্য ছুটির বলিদান দেওয়াই ভালো! লুকিয়ে ফোন করলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষককে। ছুটিটা অনেক কষ্টে ম্যানেজ করলেন।
          সুতনু বাবু স্ত্রীকে ধীরে ধীরে বললেন, ‘মেঘা, আজ আমি অম্বরের স্কুলের গার্ডিয়ান মিটিংয়ে যাবোদিদিমনি তো আকাশ থেকে পড়লেন। ব্যাপারটা গোলমেলে ঠেকলো। রাগ এতো সহজে কমার নয়! রণমূর্তি ধারণ করে বলল, ‘আমি কি একাই ওর পড়ানোর জমিদারি নিয়ে রেখেছি। বাবার তো কোন দায় দায়িত্ব নেই! পাশের ফ্ল্যাটের ইশিতাদির মেয়ে রিকা এবারেও ফার্স্ট হয়েছে। তার বাবা-মা দুজনে মিলে পড়ায়। তাহলে আমার ছেলের রোল দশ হবে না তো কি এক হবে!’
          এতক্ষণে সুতনু বুঝতে পারল দিদিমনির রাগের কারনটা। সংসারের শান্তি রক্ষায় সুতনু চুপ থাকাই শ্রেয় মনে করলরেডি হয়ে সুতনু ছেলেকে নিয়ে স্কুলের দিকে রওয়ানা হল।
          স্কুলের একটি হল ঘরের মধ্যে সভা শুরু হল। সেখানে ছাত্র-ছাত্রী, অভিভাবক-অভিভাবিকা ও শিক্ষক-শিক্ষিকারা উপস্থিত। প্রধান শিক্ষিকার দীর্ঘ উপদেশ বানী কিছুক্ষণ চলল।
          এরপর ডাক পড়ল রিকা রায়ের। সঙ্গে মা ইশিতা রায়। প্রধান শিক্ষিকা বললেন, ‘আপনার মেয়ে ক্লাসে ফার্স্ট হলেও রেজাল্ট ভালো হয়নি। অন্য সাবজেক্ট গুলোতে ফুল মার্কস পেলেও ইংলিশে পঁচিশের চব্বিশ পেয়েছে। এক কম পেয়েছে। ওকে একটু চাপ দিন। প্র্যাকটিসটা বেশি করে করান। এতো কম পড়াশোনা করলে হবে না
          ইশিতা দেবী রিকার পিঠে ঠাস ঠাস করে মারতে লাগলেনকেন এক নম্বর কম পেলি বল। তোর আজ খাওয়াই বন্ধইশিতা দেবী রাগত ভাবে বলে চললেন।
          সুতনু চুপ থাকতে পারলেন না। ইশিতা দেবীকে থামিয়ে বললেন, ‘ওকে এভাবে মারবেন না। ও তো শিশু! পরীক্ষাটাই কি জিনিস ও তো বোঝে না! তাছাড়া এখানে ওর বন্ধুরাও রয়েছে। দেখুন, বেচারীর কেমন লজ্জায় ভয়ে মুখটা লাল হয়ে গেছে!’
          ইশিতা দেবী এবার খানিকটা উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। তিনি বললেন, 'দেখুন সুতনু বাবু, এই সময়টাই ওকে মানুষ করার বয়স। খেলাধুলার জন্য সারা জীবন পড়ে আছে'বৃথা বাক্যব্যয় ভেবে সুতনু বাবু চুপ করে গেলেন।
          এরপর ইশিতা দেবী ব্যাগ থেকে একটা শ্লেট বের করলেন। সেটি প্রধান শিক্ষিকাকে দেখিয়ে বললেন, 'বাড়িতে ওকে এতো প্র‍্যাক্টিস করাই যে, খাতার যোগান দিতে হিমশিম খাচ্ছিলাম। তাই শেষে একটা শ্লেট কিনলাম। দেখুন, ওকে এত প্র‍্যাক্টিস করিয়েছি যে শ্লেটটা কেমন অস্পষ্ট হয়ে গেছে! আর কি করলে হবে বলুন তো?'
          প্রধান শিক্ষিকা বললেন, 'বা! দারুন আইডিয়া! ওকে শ্লেটেই আরো বেশি করে প্র‍্যাক্টিস করান'
          এরপর আরো কিছু অভিভাকের সঙ্গে কথা বলার পর এলো সুতনু বাবুর পালা। প্রধান শিক্ষিকা বললেন, 'আপনার ছেলের তো পজিশন দশ হয়েছে। ওর প্রতিটা বিষয়ে তিন চার নম্বর করে কম আছে। বাড়িতে বেশি করে প্র‍্যাক্টিস করান। পড়াশোনায় একটু চাপ দিন'
          সুতনু বাবু বিনীতভাবে বললেন, 'ম্যাম, কি চাপ দিই বলুন তো! ঐটুকু ছেলের ঐ ছোট্ট দেহটা কি চাপ সইতে পারবে? ওর মনটাও তো এখনও ততটা বড় হয় নি, যে এতটা চাপ নিতে পারবে!'
          প্রধান শিক্ষিকা বলে উঠলেন, 'ছেলেকে মানুষ করতে চাইলে পড়াশোনার চাপ তো দিতেই হবে'
           'হুম, মানুষ করতেই তো চাই। কিন্তু চাপ নেওয়ার মতো শরীর আর মনটা তৈরি হোক। সারা জীবন তো ওকে চাপ বইতে হবে! ওকেই ওর লড়াই লড়তে হবে! এখন ওর শৈশবটা একটু উপভোগ করুক না! মন আর শরীরের বিকাশ হয়ে গেলে দেখবেন দু'বছরের পড়া দু'মাসেই শিখে ফেলেছেওর শ্লেটটা এখন খালিই থাক! পরে প্র‍্যাক্টিসের জন্য জায়গা তো রাখতে হবে!' গড়গড়িয়ে বলে গেলেন সুতনু বাবু।
          বেগতিক বুঝে প্রধান শিক্ষিকা আর কথা বাড়ালেন না। দ্রুত সভা শেষ করে দিলেন।
          সুতনু বাবু বাড়ি ফিরতে ফিরতে ছেলে অম্বরকে বলল, 'কিরে পরীক্ষায় তো ভালই রেজাল্ট করলি। যাবি নাকি রেষ্টুরেন্টে?'
          'কিন্তু মা তো রেগে আছে। রিকা ফার্স্ট হয়েছে। আমি হতে পারিনি। মাকে আমার ভয় লাগে। আমার পড়তেই ইচ্ছে করছে না আর!' অম্বর তার বাবাকে বলল।
           'দুর বোকা ছেলে! মাকে জড়িয়ে ধরে একটা হামি খেয়ে নিবি। দেখবি মায়ের সব রাগ চলে যাবে! আর রিকা ফার্স্ট হয়েছে তো কি হয়েছে! তুই কারো সাথে তুলনা করিস না! তুই তোর মতো করে খুব ভালো রেজাল্ট করেছিস'সুতনু ছেলেকে বলল।
           'তুমি আমার খুব খুব ভালো বাবা! আমি তো ভালো রেজাল্ট করেছি! তাহলে আমায় একটা গিফট দেবে?' অম্বর বলল।
          'কি বল?' সুতনু বলল।
          'আমায় আজ মাঠে খেলতে নিয়ে যাবে? আমার রিকার সঙ্গে খেলতে খুব ইচ্ছে করে। রিকাও খেলতে চায়। ওর মা ওকে খেলতে দেয় না'
          চোখটা ছলছল করে উঠল সুতনুর। সে বলল, 'হ্যাঁ, তুই রোজ খেলতে যাবি। খেলবি বেশি করে, আর ইচ্ছে হলে পড়বি' তারা রেস্টুরেন্টে গেল। খাবারের চারটি পার্সেল নিল। অম্বর বলল, 'বাবা, আমরা তো তিনজন! চারটে পার্সেল কি হবে?''
         সুতনু বলল, 'তোর বন্ধু রিকাকে তার মা আজ খেতে দেবে না বলেছে। ওকে একটা পার্সেল লুকিয়ে দিয়ে আসবি' অম্বর খুব খুশি হল। নাচতে নাচতে বাড়ি ফিরল।
        পরের বছর ক্লাস টু’য়ের রেজাল্ট বের হল। রিকা ক্লাসে থার্ড হল। আর অম্বরের পজিশন এইট। অভিভাবক সভায় সুতনু বাবু উপস্থিত হল। সভায় রিকার মা যথারীতি রিকার পিঠে বেশ কয়েক ঘা দিল। শাস্তিও ঘোষণা করল রিকার দু'দিন খাওয়া বন্ধ। সেই সঙ্গে শ্লেটটাও দেখাতে ভূললেন না! পার্থক্যটা চোখে দেখা গেল। লিখতে লিখতে শ্লেটটা আগের চেয়ে অনেক অস্পষ্ট হয়ে গেছে।
          বাড়ি ফেরার পথে সুতনু বাবু ছেলেকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে ঢুকল। এবারে পাঁচটা পার্সেল নিল। অম্বরের কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই সুতনু বললেন, ‘তিনটে পার্সেল আমাদের জন্য। রিকার দুদিন খাওয়া বন্ধ। ওকে দুটো পার্সেল লুকিয়ে দিস। একটা ড্রাই ফুড আছে’। এবার অম্বর বলল, ‘আর আমার গিফট?’
          সুতনু বলল, ‘আজকে তোর সঙ্গে ডাবল টাইম খেলব এটাই তোর গিফট’।
         ‘আই লাভ ইউ বাবা!’ বলেই অম্বর বাবার গলাটা জড়িয়ে ধরল। সুতনু বাবুর চোখের জল এসে গেল।
         কিন্তু মেঘা দিদিমনি ছেলেকে নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন। ছেলের প্রতি বাবার ‘উদাসীনতা’ তাকে যেন আরও রুষ্ট করে তুলেছে। সংসারের শান্তি রক্ষায় সুতনু বাবু বড্ড চুপচাপ হয়ে গেছেন। শুধু অদৃশ্য ভাবে রক্ষা করে চলেন ছেলে অম্বরকে
        এই ভাবেই দু’বছর কেটে গেল। ক্লাস ফোরের রেজাল্ট আউট হয়েছে। এবার রিকা ক্লাসে টেন পজিশন পেয়েছে। আর অম্বর ক্লাসে ফার্স্ট। অভিভাবক সভায় সবাই হাজির। প্রধান শিক্ষিকার দীর্ঘ ভাষণ দিয়ে শুরু হল সভা।
        সভার শুরুতেই ইশিতা দেবী উদভ্রান্তের মতো ব্যাগ থেকে শ্লেটটা বেরঙ্করতে করতে বললেন, ‘কেন এমন হল বলতে পারেন? যে মেয়েটা ফার্স্ট হত, সে আজ পিছতে পিছতে দশ! এরপর তো ফেল করবে! এই দেখুন শ্লেটটা। এতো প্র্যাক্টিস করিয়েছি যে, শ্লেটটা আর স্পষ্ট দেখাও যায় না।  কালো শ্লেট সাদা হয়ে গেছে! আর কত প্র্যাক্টিস করাবো?’
         সুতনু বাবু নিস্পাপ মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ছিল। মানুষ হতে গিয়ে রিকার অবস্থাটা দেখে চোখটা ছলছল করে উঠল সুতনুর। এরপর তিনি দাঁড়িয়ে উঠে শুধু বললেন, ‘শ্লেটটা তো শৈশবেই ভরিয়ে ফেলেছেন। একটুও খালি রাখেন নি! প্র্যাক্টিস করবে কোথায়?’

০৫.০৮.১৮

Sunday, 9 September 2018

মজার গল্প- 'নারান' বিভ্রাট

-----‘নারান’ বিভ্রাট-----@ Rupesh
[একটি মজার ছোট গল্প]

‘নারান চৌধুরির বাড়ি কোনটা?’ গ্রামে ঢুকেই পিয়ন বাবু চিঠি হাতে খোঁজ শুরু করলেন। নারায়ণ চৌধুরীর নামে চাকরির ইন্টারভিউ এর চিঠি এসেছে। গ্রামে ঢুকলেই প্রথম বাড়িটাই নারায়ণ চৌধুরীর। চিঠিটা নিলেন তিনি। যথারীতি ইন্টারভিউও দিতে গেলেন।
গন্ডগোলটা বাঁধলো তখনই, যখনই জানা গেল এই নারায়ন চৌধুরী আসল চাকরী প্রার্থী নয়। ততক্ষণে বড্ড দেরী হয়ে গেছে। আসল চাকুরী প্রার্থী ইন্টারভিউ এর সুযোগটাই হারালো।
আসলে গণ্ডগোলের নেপথ্যে রয়েছে নাম বিভ্রাট। গ্রামের নাম নারান পুর। সেই গ্রামের অধিকাংশ মানুষের নামই নারান। ‘নারায়ণ’ নামের কথ্যরূপ ‘নারান’ শব্দটিই প্রচলিত। সবাই নারায়নকে ‘নারাণ’ বলেই ডাকে। ঐ গ্রামে শিশুর জন্মের পর প্রত্যেকে নারায়ণ দেবতার নামেই শিশুর নামকরণ করেন। প্রথম প্রথম একই নাম রাখা নিয়ে প্রতিবেশিদের মধ্যে ঝগড়াও হোত। কিন্তু দেবতা নারায়ণ তো কারও একার নয়! তিনি পুরুষ শ্রেষ্ঠ ‘পুরুষোত্তম’। ফলে তাঁর ভক্ত সংখ্যাও প্রচুর। তাঁর নামে অধিকাংশ মানুষ নাম রাখবেন এটাই স্বাভাবিক।
নামের বিভ্রাট চলতেই থাকলো। পুলিশ অপরাধী ধরতে এসে নাম বিভ্রাটে কাঙ্খিত নারানকে ধরতে হিমশিম! বিয়ের বরযাত্রী নাম বিভ্রাটে কাঙ্খিত নারানের পরিবর্তে অন্য নারানের বাড়িতে আতিথ্য গ্রহন করে চলে যায়! আরও কতো সমস্যা! বলে শেষ হবে না।
‘নামের আমি, নামের তুমি, নাম দিয়ে যায় চেনা’। আর এখানে নামটাই প্রায় সকলের একই। আবার যিনি ‘দেবতা নারায়ণ’, তিনিই ‘দেবতা হরি’। ফলে যেখানে বাবার নাম আগে থেকেই হরি আছে, সেখানে ছেলের নাম নারায়ণ  হওয়াটাই স্বাভাবিক। 'হরি' বা 'নারায়ণ' নামের মধ্য দিয়ে সকলেই নারায়ণ দেবতাকে আঁকড়ে ধরতে চায়। ফলে একই নামের বাবা এবং একই নামে ছেলের সংখ্যাটা বেড়েই চলেছে।
তাহলে কি হবে? সবাই হাজির হল গ্রামের মোড়লের কাছে। তারও নাম আবার নারাণ। তিনি গ্রামের নারায়ণ মন্দির প্রাঙ্গনে সভা ডাকলেন।
সভায় গ্রামের মানুষ হাজির। কিভাবে নাম বিভ্রাট থেকে বাঁচা যায়, সেই আলোচনা শুরু হল। কেউ বলল নারায়ণ নাম আর রাখা যাবে না। কেউ বলল নারায়ণ নাম পালটে ফেলতে হবে। সভায় প্রবল বাক-বিতণ্ডা শুরু হয়ে গেল। কেউই নারায়ণ নামের স্বত্ব ছাড়তে চায় না।
মোড়লের দাপট প্রচুর। সবাইকে চুপ করিয়ে দিয়ে মোড়ল একটা প্রস্তাব উত্থাপন করলেন। তিনি বললেন, ‘নারাণ নামটির সাথে প্রত্যেকের পেশা, শারিরীক গঠন ইত্যাদি জুড়ে দেওয়া হোক। তাতে আর নাম বিভ্রাট থাকবে না’। এই প্রস্তাবে সবাই রাজী হয়ে গেল।
এবার একেক নারাণকে ধরে নামকরণ শুরু হল। প্রথম যে নারাণকে ধরা হল, তিনি পেশায় কাঠ মিস্ত্রী। তাই তার নাম হল, ‘কেঠো নারাণ’। এরপর যিনি, তিনি পেশায় ছুতোর মিস্ত্রী। তার নাম স্থির হল, ‘ছুতোর নারাণ’। একজন ছিলেন বেঁটে, তার নাম স্থির হল, ‘গেঁঠে নারাণ’। এই ভাবে লম্বা হওয়ায় ‘লম্বু নারাণ’, গায়ের রঙ কালো হওয়ায় ‘কেলো নারাণ’, গায়ের রঙ ফর্সা হওয়ায় ‘ফর্সা নারাণ’, পিঠে কুঁজ থাকায় ‘কুঁজো নারাণ’, একটি পা খোঁড়া হওয়ায় ‘খোঁড়া নারাণ’, কানে শুনতে পায়না বলে ‘কালা নারাণ’, একচোখ অন্ধ বলে ‘কানা নারাণ’, পেশায় কামার বলে ‘কামার নারাণ’, মুদিখানা দোকান আছে বলে ‘মুদি নারাণ’।
কিন্তু গণ্ডগোল দেখা দিল এক ভবঘুরে মাতালকে নিয়ে। প্রস্তাব এলো, ওর নাম রাখা হোক ‘ভবঘুরে নারাণ’। কিন্তু মোড়ল বাবু বললেন, ‘না, ও সারাদিন মদ খেয়ে ঘুরে বেড়ায়। ওর নাম রাখা হোক ‘মাতাল নারাণ’।’ ভবঘুরে মাতালের কোন প্রতিবাদই শোনা হল না। তার নাম স্থির হয়ে গেল, ‘মাতাল নারাণ’। এরকম আরও অনেক নাম স্থির হল। বলে শেষ হবে না।
এবার শেষে সবাই চিন্তায় পড়লো, মোড়লের নাম কি হবে। তারও নাম তো নারাণ। এমন সময় ‘মাতাল নারাণ’ গর্জে উঠল। তিনি বললেন, ‘মোড়ল বাবুর দুধের ব্যবসা। প্রচুর গরু বাড়িতে রয়েছে। তাই ওনার নাম হোক, ‘গরু নারাণ’।’ গোটা বিচার সভাটাই স্তব্ধ হয়ে গেল। সবাই এর মুখ নিচু হয়ে গেল। কারও মুখে কোন কথা নেই। শুধু মোড়লের রাগে লাল হয়ে যাওয়া মুখটা দেখা যাচ্ছিল।
@ রূপেশ সামন্ত/ ০৮.০৯.২০১৮/ ছবি- নিজস্ব
বি.দ্র.- লেখাটির কপিরাইট লেখক কতৃক সম্পূর্ণ রূপে সংরক্ষিত। গল্পের স্থান, কাল, চরিত্র সম্পূর্ণ কাল্পনিক। কোন নাম, বিষয়বস্তু, পেশা বা ধর্ম বিষয়ে আঘাত করা লেখকের মোটেই উদ্দেশ্য নয়। কোথাও কোন মিল থাকলে, তা নেহাতই কাকতালীয়। কাউকে দুঃখ দেওয়া মোটেই উদ্দেশ্য নয়। সেক্ষেত্রে আমি ক্ষমা প্রার্থী। এটি একটি মজার গল্প মাত্র। সাধারণ একটি গল্পের দৃষ্টিতেই গল্পটিকে দেখবেন।

Wednesday, 2 May 2018

আদর্শ ছাত্র: একটি অসাধাণ গল্প


-------- ----- --- --আদর্শ ছাত্র-- --- ----- --------
 

‘ধনঞ্জয় স্যার ক্লাসে আসছেন? কি আর করবে! আমি অতো ভয় পাই না।’ বুম্বা বলল। বুম্বা তখনও হাইবেঞ্চে সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে বসে সমানে দাদাগিরি করছে। হাতের আঙ্গুলে ‘সুদর্শণ চক্রে’র মতো গলার চেনটাকে নিয়ে বনবন ঘুরিয়ে চলেছে। পাশে সাঙ্গোপাঙ্গরা যোগ্য সঙ্গত করছে। দশম শ্রেণির ইংরাজীর ক্লাস। ধনঞ্জয়বাবু ক্লাসে প্রবেশ করলেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ক্লাসের ফার্স্টবয় তথা মনিটার নান্টু উঠে দাঁড়াল এবং বুম্বার বিরুদ্ধে একগুচ্ছ অভিযোগ জানালো। বুম্বা সব দোষ স্বীকার করে নেওয়ায় শাস্তিটা একটু কমই হল। মাত্র পঞ্চাশ বার কান ধরে ওঠ-বোস। কিন্তু নান্টু ছাড়ার পাত্র নয়। সে আবার অভিযোগ আনল, ‘স্যার, ওর পকেটে ছুরি আছে।’ বুম্বা হাতে নাতে ধরা পড়ল। বুম্বার আত্মপক্ষ সমর্থনের সব চেষ্টা ব্যর্থ হল। স্বভাবতই বিচার পাঠিয়ে দেওয়া হল হেডস্যারের কোর্টে।
হেডস্যার গার্ডিয়ান-কল-লেটার বুম্বার হাতে ধরিয়ে পরের দিন বাবা সহ দেখা করতে বললেন। এদিকে আগামীকাল স্টাফ কাউন্সিল মিটিং ডাকা হয়েছে বুম্বার শাস্তির বিষয়টি আলোচনার জন্য।
স্টাফ কাউন্সিল মিটিংয়ে বুম্বাকে টি.সি. দেওয়ার জন্য ধনঞ্জয়বাবু জোরদার সওয়াল করলেন। আরও কিছু শিক্ষক ধনঞ্জয়বাবুর পক্ষ নিলেন। কেউ বলল, ‘ও একটা ক্রিমিন্যাল।’ কেউ বলল, ‘ওর জন্যই ক্লাসের ডিসিপ্লিন নষ্ট হচ্ছে।’ বুম্বার শাস্তির পক্ষে সবাই প্রায় এককাট্টা। ঠিক এমন সময় স্টাফ কাউন্সিল সেক্রেটারী তথা ইংরাজীর আরেক জন শিক্ষক সমরেশবাবু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘ক্রিমিন্যালই হোক, বা ইনডিসিপ্লিন্ড। দায়ী কিন্তু আমরাই। ও তো ছোট ছেলে! ওর কাউন্সেলিং প্রয়োজন। ওকে আরো সুযোগ দেওয়া উচিৎ।’ সমরেশবাবু অত্যন্ত দায়িত্ববান শিক্ষক এবং প্রভাবশালীও। হেডস্যার সমরেশবাবুর কথা উড়িয়ে দিতে পারলেন না। তাই কঠোর শাস্তির পরিবর্তে বুম্বাকে সতর্ক করার পক্ষেই মত দিলেন। বুম্বার বাবাকে সবটা জাাানিয়ে এবারের মতো বুম্বাকে ছেড়ে দেওয়া হল।
সমরেশবাবু বুম্বাকে একান্তে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি ছুরি নিয়ে ক্লাসে এসেছো?’ বুম্বা বলল, ‘না স্যার। আমি কাঁচা আম কাটার জন্য ছোট একটা ছুরি এনেছিলাম। নান্টু আমাকে সবসময় ধনঞ্জয় স্যারের ভয় দেখায়। তাই ওকে আমি ছুরি দিয়ে ভয় দেখিয়ে ছিলাম।’ তখন সমরেশবাবু বললেন, ‘কিন্তু তুমি ক্লাসে খুব ডিস্টার্ব করো। তোমার পড়াশোনা করতে ভালো লাগে না?’ বুম্বা বলল, ‘না স্যার। আমার শুধু খেলতে ভালো লাগে।’ সমরেশবাবু বললেন, ‘ক্লাসে আর গন্ডগোল করবে না। কাল থেকে অ্যানুয়াল স্পোর্স্টস শুরু হচ্ছে। অনেক কাজ আছে। আগামীকাল সকাল সাতটায় চলে আসবে।’ ‘ঠিক আছে স্যার’, বলে বুম্বা চলে গেল।
পরদিন বুম্বা সকাল ছ’টা থেকে সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে হাজির। গোটা মাঠ দাপিয়ে খেলার প্রস্তুতির কাজ করে যাচ্ছে। শুধু কোন কিছুর নির্দেশ দিলেই হল! সঙ্গে সঙ্গে কাজ হাসিল। এরপর খেলা শুরু হল। বুম্বা দু’শো মিটার দৌড়ে প্রথম। ছুটে এসে সমরেশবাবুকে ট্রফিটা দেখালেন। সমরেশবাবু বুম্বার পিঠটা চাপড়ে দিলেন।
কয়েক দিন পর বুম্বা আরেক কাণ্ড ঘটিয়ে বসল। টিফিনে মেয়েরা যখন দো’তলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামছিল, তখন বুম্বা পা বাড়িয়ে দেওয়ায় শিউলি সিঁড়ির মধ্যে পড়ে যায়। হাত কেটে গিয়ে গলগল রক্ত বেরোচ্ছে। এরপর নান্টু দ্রুততার সঙ্গে খবরটা ধনঞ্জয়বাবুর কানে তুলে দেয়। তখন ধনঞ্জয়বাবু প্রবল উৎসাহে ঘটনাটি হেডস্যারের কানে তুলে এবং টি.সি. দেওয়ার জন্য দাবী করে। স্বভাবতই গার্ডিয়ান-কল-লেটার বুম্বার হাতে ধরিয়ে দেওয়া হল। স্টাফ কাউন্সিল মিটিংও ডাকা হল।
স্টাফ কাউন্সিল মিটিংয়ে আক্রমনের ঝড় দেখে সমরেশবাবু নিজেকে মৌন রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন। টি.সি. দেওয়ার সুপারিশ পরিচালন কমিটির সভায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হল। সমরেশবাবু বুম্বাকে ডেকে এইরূপ আচরনের কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। বুম্বা বলল, ‘আমি পড়া পারিনা বলে শিউলি ক্লাসে সবসময় আমাকে ইনসাল্ট করে। তাই আমি ওকে ফেলে দিয়েছি।’ সমরেশবাবু ধমক দিয়ে বললেন, ‘তুমি অন্যায় করেছ।’
সমরেশবাবু পরিচালন কমিটির সদস্য। পরিচালন কমিটির সভায় অনেক লড়াই করে বুম্বার শাস্তি রদ করতে সমর্থ হল। তবে শেষবারের মতো। পরবর্তী কালে বুম্বার কোন অপরাধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদানের ক্ষমতা হেডস্যারকে দেওয়া হল।
নান্টু ধনঞ্জয়বাবুর খুবই প্রিয় ছাত্র। ক্লাসে ফার্স্ট হয় এবং শৃঙ্খলাপরায়নও। বুম্বার শাস্তি মুকুবের কথা শুনে ধনঞ্জয়বাবু রাগে ঘোষনা করলেন, ‘নান্টুর রেজাল্ট খারাপ হলে বুম্বাই দায়ী থাকবে। ওই ক্লাসটাকে নষ্ট করছে।’
এরপর ক্লাসে প্রতিনিয়ত নান্টু সহ অন্যান্যরা বুম্বাকে ইনসাল্ট করতে থাকে। ধনঞ্জয়বাবুও কম যান না! তিনিও ক্রমাগত বুম্বাকে অপদস্ত করতে থাকেন।
বুম্বার ধৈর্যের সীমা ছাড়িয়ে যেতে থাকল। একদিন গোটা রাজ্যে একটি খবরে চাঞ্চল্য ছড়াল। খবরের কাগজের হেডিং, ‘আজ ধনঞ্জয়ের ফাঁসি।’ ব্যাস! আজ যেন বুম্বার সমস্ত ভিতরের রাগ উগরে দেওয়ার দিন। ‘ধনঞ্জয়’ নামের মিলটাই যেন যথেষ্ট। স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের নিয়ে একটি খড়ের পুতুল বানালো। একটি কাগজে ‘ধনঞ্জয়’ কথাটি লিখে পুতুলে আটকে দিল। এরপর টিফিনে স্কুলের তিন তলায় গিয়ে একটি ফাঁকা রুমে পুতুলটিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিল। সঙ্গে উল্লাস আর চিৎকার, ‘ধনঞ্জয় স্যারের ফাঁসি! ধনঞ্জয় স্যারের ফাঁসি!’ খবর দ্রুত চাউর হয়ে গেল গোটা স্কুলে। নান্টু ছুটল ধনঞ্জয় স্যারকে খবর দিতে।
হেডস্যারকে ধনঞ্জয়বাবু সহ কয়েক জন শিক্ষক ঘিরে ধরল। টি.সি. দেওয়ার জন্য প্রবল চাপ দিতে থাকল। হেডস্যার টি.সি. লিখতে শুরু করলেন। সমরেশবাবু নির্বাক। নিরুপায়ও। সমরেশবাবুর অভিমান ভরা রাগও হচ্ছিল বুম্বার উপর। চাইছিলেন বুম্বা শাস্তিই পাক!
টি.সি. হাতে ধীরে ধীরে স্কুল থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে বুম্বা। মাথাটা নিচু। সমরেশবাবু বারান্দায় দাঁডিয়ে ছিল মাথাটা নিচু করে। বুম্বা গেট দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো সমরেশবাবুর দিকে একবার তাকালেন। নান্টুর উল্লাস সমরেশবাবুর চোখ এড়ালো না। স্টাফরুম থেকে ধনঞ্জয়বাবুদের উচ্ছাস কানে ভেসে আসছিল।
কয়েক বছর পর হঠাৎ একদিন স্কুল যাওয়ার পথে সমরেশবাবুর বুম্বার সঙ্গে দেখা হল। রাস্তার পাশে বসে বিশ্রাম নিচ্ছে। সঙ্গে আরও অনেকে। বুম্বা প্রনাম করল। ‘তুমি এখন কি কোরছ?’ সমরেশবাবু জিজ্ঞাসা করল। বুম্বা বলল। ‘আমি এখন মাটি কাটার কাজ করি, স্যার।’ স্কুলের দেরি হয়ে যাচ্ছে বলে সমরেশবাবু চলে গেলেন।
এরপর একদিন স্কুলে একটি ঘটনা ঘটল। ক্লাসে দুষ্টুমি করায় ক্লাস ফাইভের সেরাফৎ নামে একজন ছাত্রকে ধনঞ্জয়বাবু খুব মারধর করল। সেরাফৎ বাড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়ল। তাকে নার্সিং হোমে ভর্তি করতে হল। যেন আগুনে ঘি পড়ল। পরদিন স্কুলে সেরাফৎ এর বাবা-মা সহ পুরো পাড়া স্কুলে হাজির হল। স্কুল ঘেরাও করল। তাদের দাবী, এখনই ধনঞ্জয়বাবুকে তাদের হাতে তুলে দিতে হবে অথবা পুলিশি পদক্ষেপ করতে হবে। সমস্ত শিক্ষক ভয়ে জড়সড়। কিছু উটকো লোক জুটে গেল। ক্রমশ ভিড় বাড়তে থাকল। দু’চারটে দোকানও বসে গেল। ফুচকা, চানা, পান, সিগারেট কত কিছু! হই হই চলছে। শিক্ষক বিরোধী আবেগটা যেন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ শুরু হয়ে গেল। এতো মানুষের আবেগ! এতো মানুষকে একসঙ্গে পাওয়া! মুখের কথা! সামনে ভোট। অতয়েব কাজে লাগাতে হবে। মাইক বাঁধা হল। মাইকে ঘোষনা হচ্ছে, ‘আর কিছু ক্ষনের মধ্যে এখানে এসে পৌঁছাবেন আমাদের যুবনেতা নান্টুদা।’
নামটা শুনেই চমকে উঠলেন ধনঞ্জয়বাবু। যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। তার আদর্শ ছাত্র নান্টু আসছে। নিমেষে চনমনে হয়ে উঠলেন। কিছুক্ষনের মধ্যে নান্টু পৌঁছালো এবং জনতা পরিবৃত হয়ে জ্বালাময়ী বক্তব্য শুরু করল। ধনঞ্জয়বাবু অফিস থেকে বেরিয়ে জনতার ব্যারিকেড ভেঙে নিশ্চিন্ত আশ্রয় লাভের জন্য নান্টুর দিকে দৌড় লাগালো। জনতা রে রে করে উঠল। সবাই ধনঞ্জয়বাবুকে ঘিরে ধারল। প্রবল উত্তেজনা আর ধাক্কা-ধাক্কির মধ্যে ছুটে এলো নান্টু। প্রবল উৎসাহে ধনঞ্জয়বাবুর মুখে মারল একটা ঘুঁষি। ভোট যে বড় বালাই! জনতার সেন্টিমেন্ট বলে কথা!
এরপর আহত ও রক্তাক্ত ধনঞ্জয়বাবুকে ধরে অফিসে ঢুকিয়ে দেওয়া হল। অন্যান্য শিক্ষকদেরও অফিসে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দেওয়া হল। বাইরে নেতাদের ভাষন চলছে। সারা রাত্রি ব্যাপী আন্দোলনের তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। চলছে চাঁদা তোলাও।
এই অশান্তির খবর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। বুম্বার কানেও পৌঁছালো। বুম্বা কাছাকছিই একটি পুকুরে মাটি কাটার কাজ করছিল। খবরটা শুনেই অন্যান্যদের নিয়ে স্কুলের দিকে ছুটল। কারো হাতে কোদাল। কারো হাতে জঙ্গল সাফ করার কাস্তে।
স্কুলের পেছন দিয়ে প্রাচীর টপকে বুম্বা তার দলবল নিয়ে অফিসের সামনে পৌঁছে গেল। বুম্বাকে দেখে নান্টু যেন তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল। স্কুল জীবনের রাগটা আজই মিটিয়ে নেবে ঠিক করল নান্টু। নান্টু দলবল নিয়ে বুম্বার দিকে তেড়ে গেল। বুম্বা সজোরে একটা ঘুঁষি চালালো নান্টুর মুখে। নান্টু মাটিতে পড়ে গেল এবং গলগল করে রক্ত বেরোতে শুরু করল। নেতা পড়ে যেতেই জনতা ছুট লাগালো এদিক ওদিক। সব ছত্রভঙ্গ। কোনরকমে দু’জন নান্টুকে ধরে তুলে নিয়ে চলে গেল। চারিদিক শুনশান।
এরপর বুম্বার কোদালের এক ঘায়ে ভেঙে গেল অফিসের দরজার তালা। বুম্বা অফিসে ঢুকে ঘোষনা করল, ‘আপনারা এখন নিরাপদ। এবার নির্ভয়ে বাড়ি যান।’ হেডস্যারের চোখে জল। হেডস্যার বললেন, ‘এই চেয়ারে বসেই তোমার টি.সি. লিখেছিলাম। তুমিই আজ এই চেয়ারের মর্যাদা রক্ষা করলে!’ বুম্বা বলল, ‘স্যার, ছাড়ুন ওসব কথা।’ সমরেশবাবুর দিকে বুম্বা তাকালো। গর্বে রুদ্ধ হয়ে আসা কন্ঠে সমরেশবাবু কোন কথা বলতে পারলেন না। শুধু মাথাটা উঁচু করে বসেছিলেন। আর ধনঞ্জয়বাবুর সঙ্গীরা মাথা নিচু করে বসেছিল। ‘আদর্শ ছাত্রে’র সংজ্ঞাটা সকলের কাছে কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছিল! বুম্বা তখনও ধনঞ্জয়বাবুর রক্তক্ষরণ বন্ধের জন্য প্রাথমিক চিকিৎসা করে যাচ্ছিল। অবশেষে বন্ধ হল রক্তক্ষরণ। কিন্তু ধনঞ্জয়বাবুর চোখের জলটা বলে দিচ্ছিল, তখনও বন্ধ হয়নি হৃদয়ের রক্তক্ষরণ।

বি.দ্র. - স্থান, কাল, চরিত্র ও ঘটনা সম্পূর্ণ কাল্পনিক।

-শ্রী রূপেশ কুমার সামন্ত/ ২৪.০৩.১৮



বাংলাদেশের ভারত বিরোধিতা: আবেগ না রাষ্ট্রবুদ্ধি?

বাংলাদেশের ভারত বিরোধিতা: আবেগ না রাষ্ট্রবুদ্ধি? ✍️ রূপেশ কুমার সামন্ত  বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে সাম্প্রতিক কালে ভা...