Showing posts with label History & Tradition. Show all posts
Showing posts with label History & Tradition. Show all posts

Sunday, 11 May 2025

লবন থেকে লক্ষ্মী- পলাশীর নন্দীদের জমিদারী উত্থানের গল্প

 লবন থেকে লক্ষ্মী- পলাশীর নন্দীদের জমিদারী উত্থানের গল্প

রূপেশ কুমার সামন্ত






















ভূমিকা

কাশিজোড়ার ধান, ময়না রাজার মান।

কুচোল ঘোড়ইয়ের পাকা, দে-নন্দীর টাকা।

পলাশীর নন্দী বাড়ির অঢেল ঐশ্বর্যকে ইঙ্গিত করেই প্রবচনের আপ্তবাক্যের ‘নন্দীর টাকা’ অংশটি প্রতিষ্ঠিত। উনবিংশ শতকের গোড়ায় উদীয়মান ব্যবসায়িক পরিবার নন্দীরা লবন ব্যবসার উপর ভিত্তিক করে প্রভূত অর্থ উপার্জন করেছিল। তখন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসন। শাসকের কৃপা ও অর্থ-বলের মেলবন্ধনে কিভাবে অর্থ নামক ‘চঞ্চলা লক্ষ্মী’কে বশিভূত করে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’কে উপচে ফেলতে হয়, তা নন্দীরা ভাল জানত। তাঁরা লবন ব্যবসার অর্থকে বিনিয়োগ করে জমিদারী ক্রয় করলেন। নন্দী পরিবারের সুযোগ্য সন্তান শ্রীনাথ নন্দী ও দীনবন্ধু নন্দী ডেবরার পলাশীতে গড়ে তুললেন জমিদারী সাম্রাজ্য। ফুলেফেঁপে উঠল জমিদারী ‘রাজকোষ’। তাঁরা গড়ে তুললেন বিরাট জমিদারী সাম্রাজ্য, বিলাসবহুল বাড়ি, রাজকীয় মন্দির, অনিন্দ্যসুন্দর রাসমঞ্চ। তৎকালীন দারিদ্র-পীড়িত সমাজের মাঝে নন্দী বাড়ির রাজকীয় বৈভব মানুষের মননে রূপকথার গল্প হিসাবে স্থান করে নেয়। আর প্রবচন হয়ে ঘুরে বেড়ায় মানুষের মুখে মুখে।


নন্দীদের জমিদারী প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

১৭৯৩ সালে ভারতের তৎকালীন গভর্ণর জেনারেল লর্ড কর্ণওয়ালিশ ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ প্রবর্তন করেন। এর ফলে বাংলার রাজস্ব বিভাগ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সাধিত হয়। নতুন এই বন্দোবস্ত অনুযায়ী, জমিদারদের সঙ্গে বার্ষিক রাজস্ব নির্ধারিত হারে স্থায়ীভাবে চুক্তি সম্পাদিত হয়। সেই রাজস্বের পরিমান পূর্ববর্তী দশসালা বন্দোবস্তের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। ফলে জমিদারদের একটি অংশ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট করের বোঝা বহন করে জমিদারী ধরে রাখার কাজটি কঠিন ছিল। উপরন্তু, খরা, বন্যা বা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য কর পরিশোধে কোন ছাড় ছিল না। ফলস্বরূপ, তাৎক্ষণিকভাবে অনেক জমিদারের কর বকেয়া পড়ে যায়। বকেয়া জমিদারির জমি নিলামে তোলার কোম্পানির নীতির ফলে জমির বাজার তৈরি হয়। বর্ধিত করের বোঝা মেনে নিয়ে কিছু প্রাচীন জমিদার তাঁদের জমিদারি রক্ষা করতে সক্ষম হন। কিন্তু অনেকে কর দিতে অসম্মত হওয়ায় বা অপারগ থাকায় তাঁদের জমিদারি বাজেয়াপ্ত হয়। ঠিক এই সময়েই গড়ে ওঠে এক নতুন শ্রেণির জমিদার—যাঁরা বিভিন্ন পেশার মাধ্যমে বিপুল অর্থ সঞ্চয় করে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে জমিদারি বন্দোবস্ত গ্রহণ করেন। কেউ কেউ আবার জমিদার বা তালুকদারদের কাছ থেকে জমিদারী বন্দোবস্ত নিয়ে অথবা সরাসরি জমিদারি কিনে জমিদার হয়ে ওঠেন। এই নতুন জমিদার শ্রেণির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন মেদিনীপুর শহরের জন্মেজয় মল্লিক, মালিঘাটির ছকুরাম চৌধুরী এবং পলাশীর শ্রীনাথ নন্দী ও দিনবন্ধু নন্দী। এই নতুন জমিদার শ্রেণি বাংলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় সূচনা করেছিলেন।


জমিদারী প্রতিষ্ঠা

নন্দী পরিবারের আদি নিবাস ছিল বর্তমান পশ্চিম মেদিনীপুরের আনন্দপুর গ্রামে। সেই সময় রেশম শিল্পে উন্নতির কারণে আনন্দপুর মেদিনীপুর জেলার মধ্যে অত্যন্ত গূরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রেশম শিল্পের সেই রমরমা বাজারেও দূররদর্শী নন্দী পরিবার রেশম ব্যবসার সাথে যুক্ত হয়নি। তাঁরা করতেন মানুষের অতি প্রয়োজনীয় ও নিত্য-ব্যবহার্য লবনের ব্যবসা। ১৮শ শতকের মাঝামাঝি থেকে ইংল্যান্ডে শুরু হয় শিল্প বিপ্লব, যা পরে পুরো ইউরোপ ও আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে। এই বিপ্লবের ফলে ইউরোপীয়দের প্রচুর কাঁচামাল ও নতুন বাজারের প্রয়োজন দেখা দেয়। তারা উপনিবেশ থেকে সেই কাঁচামাল সংগ্রহ করা এবং সেখানে নিজেদের তৈরি পণ্য রপ্তানি করার নীতি গ্রহন করে। সেই সময় কোম্পানি ভারতীয় লবণ উৎপাদন নিষিদ্ধ করে বিদেশ থেকে কল-কারখানায় প্রস্তুত লবণ আমদানি করার নীতি নেয়। লবণ বোঝাই জাহাজ এসে ভিড়ত কলকাতার বন্দরে। নীলামে ডাকা সেই লবণ সংগ্রহ করে, বস্তাবন্দী করে বাজারজাত করাই ছিল নন্দী পরিবারের দায়িত্ব। তাঁদের কলকাতার ব্যবসা কেন্দ্র ছিল ২ নং অহিরীটোলা স্ট্রিট। লবণ পরিবহনে সুবিধা পাওয়ার জন্য তাঁরা আনন্দপুর ছেড়ে প্রথমে চলে আসেন ডেবরার ডাররা গ্রামে। তারপর সেখান থেকে চলে আসেন কাঁটাপুকুরে। এই স্থানান্তরের মূল কারণ ছিল কলকাতা থেকে মেদিনীপুর অঞ্চলে লবণ পরিবহনের সুবিধা, যা তখন জলপথেই সবচেয়ে সহজ ছিল। পলাশী গ্রামের পাশ দিয়ে চলে গেছে মেদিনীপুর খাল। সেই সময়ের যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের অন্যতম প্রধান পথ ছিল এই খাল। লবণ ব্যবসা থেকে বিপুল মুনাফা অর্জন করেছিলেন নন্দীরা। লবন ব্যবসার সূত্রে ব্রিটিশদের সাথে যোগাযোগের সুবাদে শ্রীনাথ নন্দী ও দীনবন্ধু নন্দী অর্থ বিনিয়োগ করে তাঁদের জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পলাশী গ্রামে গড়ে তুললেন স্থায়ী জমিদারী বসতি। পলাশী গ্রামটি পশ্চিম মেদিনীপুরের ডেবরা থানার অন্তর্গত। এই পলাশী গ্রামে আজও রয়েছে সেই জমিদারী বাড়ি, রাজকীয় লক্ষ্মী-জনার্দন মন্দির, রাসমঞ্চ ও ধ্বংসপ্রায় বিশাল নাটমন্দির। 

জমিদার পরিবার

পলাশীতে জমিদারী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শ্রীনাথ নন্দী ও দিনবন্ধু নন্দী। জমিদার পরিবারের বংশলতিকা বিশ্লেষণ করে জানা যায়, দুই পুরুষ আগে জমিদার পরিবারের সর্বোচ্চ পুরুষ ছিলেন গোবিন্দ চরণ নন্দী। তাঁর পুত্র ছিলেন যুগল বিহারী নন্দী। যুগল বিহারীর দুই পুত্র ছিলেন- পুরুষোত্তম ও গোলক মোহন নন্দী। পুরুষোত্তমের একমাত্র পুত্র ছিলেন শ্রীনাথ। অন্যদিকে গোলক মোহনের একমাত্র পুত্র ছিলেন দীনবন্ধু। এই শ্রীনাথ নন্দী ও দীনবন্ধু নন্দীর হাত ধরেই জমিদারী প্রতিষ্ঠা। শ্রীনাথ নন্দীর পুত্র ছিলেন নবদ্বীপ নন্দী। নবদ্বীপের দুই পুত্র ছিলেন- কিশোরী রঞ্জন ও শান্তভূষণ। কিশোরী রঞ্জন ছিলেন নিঃসন্তান। শান্তভূষণের ছিল পাঁচ পুত্র- ব্রজদুলাল, রামদুলাল, সুহৃদ কুমার, প্রণব কুমার ও প্রাণ কুমার। ব্রজদুলালের পুত্র ছিলেন দেবাশীষ নন্দী। অপর দিকে দীনবন্ধু নন্দীর দুই পুত্র ছিলেন অধরচাঁদ এবং রাইচরণ। এদের মধ্যে রাইচরণ ছিলেন নিঃসন্তান। অধরচাঁদের চার পত্নীর মধ্যে প্রথমা পত্নীর সন্তান ছিলেন নীরদ বরণ এবং চতুর্থ পত্নীর সন্তান ছিলেন ননীগোপাল। বাকি দুই পত্নীর কোন সন্তান ছিল না। নীরদ বরণের দুই পুত্র ছিলেন অমলেন্দু ও বিমলেন্দু। অমলেন্দুর তিন পুত্র ছিলেন প্রদীপ, সপ্তদীপ ও সন্দীপ। বিমলেন্দুর পুত্র ছিলেন কৃষ্ণেন্দু। অপরদিকে, ননীগোপালের পুত্র ছিলেন শুভেন্দু এবং তাঁর পুত্র ছিলেন সংলাপ।

মন্দির স্থাপন

জমিদারী বসত বাড়ির পূর্বদিকে নির্মিত হয়েছে লক্ষ্মী-জনার্দন মন্দির। রাজকীয় মন্দিরটি জমিদারী বৈভবের বহিঃপ্রকাশ। পূর্বমূখী মন্দিরটি নির্মিত হয়েছে দালান রীতিতে। উঁচু ভিত্তিবেদীর উপর প্রতিষ্ঠিত আয়তকার মন্দিরটি খিলান রীতিতে নির্মিত তিনটি প্রবেশ দ্বার যুক্ত। প্রবেশ দ্বারের পরেই রয়েছে প্রসারিত অলিন্দ। অলিন্দের পেছনে রয়েছে তিনটি কক্ষ। মাঝের গর্ভগৃহে রয়েছে দেবতার অধিষ্ঠান। মন্দিরের সামনের দেওয়ালে অনিন্দ্যসুন্দর নানান টেরাকোটা ফলক এখনও বিদ্যমান। টেরাকোটা ফলকে দৃশ্যমান দেবী দশভূজা, বংশীবাদন রত শ্রীকৃষ্ণ, দশাবতার, বাজনা বাদক ও নানান সামাজিক দৃশ্য। মন্দিরের শীর্ষে রয়েছে গরুড় মূর্তি।  


নাটমন্দির

মন্দিরের সামনে পূর্বদিকে ছিল দোতলা-সম বিরাট নাটমন্দির। বিশাল বিশাল গোলাকৃতির থামের মাথায় সমতল ছাদ দিয়ে নাটমন্দিরটি তৈরি হয়েছিল বলে জানা যায়। সেই নাটমন্দিরটি বর্তমানে ধ্বংসপ্রায়। ধ্বংসপ্রাপ্ত গোলাকার থামের শেষ চিহ্ন গুলি এখনো দেখা যায়। চারিদিকে বিশাল উঁচু প্রাচীর এখনও বিদ্যমান। নাটমন্দিরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোনে একটি অব্যবহৃত প্রসস্থ সুড়ঙ্গ রয়েছে। বাহ্যিক ভাবে এখনও দৃশ্যমান সেই সুড়ঙ্গটি দোতলা থেকে মাটির নিচে নেমে এসেছে। সুড়ঙ্গটি নিয়ে নানান রহস্য-গল্প লোকমুখে আজও প্রচারিত।  


বিগ্রহ ও পুজার্চনা

জমিদার বাড়ির লক্ষ্মী-জনার্দন মন্দিরে লক্ষ্মী-নারায়ণের কোন বিগ্রহ নাই। শালগ্রাম শিলাই তাঁর বিগ্রহ হিসাবে পুজিত হন। পুজার্চনার জন্য প্রায় সমূহ জমিদারী সম্পত্তি দেবতার নামে উৎসর্গ করে দিয়েছিল জমিদার পরিবার। জমিদারীর বিপুল অর্থে একটি রাজকীয় মন্দির নির্মান করে ছিলেন তাঁরা। বিভিন্ন পার্বন ও নিত্যপুজায় বিপুল অর্থ ব্যয় করত জমিদার পরিবার। ফলে প্রতিটি পার্বন হত অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ। স্বাধীনতার পরে দেবত্ত্বর সম্পত্তি খাস হয়ে যাওয়ায় ভাঁড়ারে টান পড়ে। বর্তমানে জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে না হলেও দিনে তিনবার নিত্যপুজা হয় এখানে। সকালে ফলমুলের সাথে মিষ্টান্নের বাল্যভোগ দেওয়া হয়। দুপুরে লুচি ও তিনটি ভাজা সহ ভোগ দেওয়া হয়। রাতে লুচি ও ক্ষীর ভোগ নিবেদন করা হয়। বিভিন্ন বার্ষিক পার্বনে যথা সম্ভব জাঁকজমক বজায় রাখা হয়। এখানে শ্রাবন মাসের শুক্লা ত্রয়োদশী থেকে তিন দিনের ঝুলনযাত্রা হয়। ভাদ্রমাসে পালিত হয় জন্মাষ্টমী ও রাধাষ্টমী। কার্তিক মাসের পূর্ণিমায় এখানে রাস উৎসব হয়। এজন্য সুদৃশ্য ও রাজকীয় এক রাসমঞ্চও রয়েছে। এই উৎসব বিশ দিন যাবৎ চলে। রাস উৎসবের পূর্বে পালিত হয় গোবর্ধন যাত্রা। পৌষ সংক্রান্তিতে পালিত হয় মকর। এছাড়াও ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমায় পালিত হয় দোল উৎসব।


জমিদারী উচ্ছেদ

জমিদারী উচ্ছেদ ভারতের স্বাধীনতা-পরবর্তী এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ, যার মাধ্যমে কৃষকদের জমির মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া হয় এবং জমিদারদের শোষণমূলক প্রথার অবসান ঘটে। ১৭৯৩ সালে ব্রিটিশদের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথার মাধ্যমে যে জমিদার শ্রেণির উত্থান ঘটে, তা ভারতে গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে চিরস্থায়ী বিলুপ্তির পথে যাত্রা শুরু করে। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন রাজ্যে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে ১৯৫৩ সালের 'Estates Acquisition Act'-এর মাধ্যমে জমিদারদের অতিরিক্ত জমি সরকার অধিগ্রহণ করে কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করে এবং ভূমির মালিকানা তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এইভাবে উনবিংশ শতকের গোড়ায় পলাশীর শ্রীনাথ ও দীনবন্ধু নন্দীর হাত ধরে গড়ে ওঠা পুরুষানুক্রমের জমিদারী স্বাধীন ভারতে উচ্ছেদ হয়ে যায়। জানা যায়, জমিদারী উচ্ছেদের ফলে বিপুল পরিমান দেবোত্তর সম্পত্তি খাস হয়ে যাওয়ায় সরকার থেকে মাত্র ১১,১৪৪ টাকা বার্ষিক ভাতা ধার্য্য করা হয়। এই অর্থে আর জমিদারী বৈভব বজায় রাখা সম্ভবপর ছিল না। ধীরে ধীরে রাজকীয়তার পলেস্তারা খসতে থাকে। ভেঙে পড়ে বিশাল নাটমন্দির। একসময় সেখানে বসত জমিদারী বিচার সভা। নাট্যমঞ্চে পরিবেশিত হত নাটক, নৃত্য, যাত্রা। তবে আজও প্রবচনের ‘নন্দীর টাকা’র জোরকে সত্য প্রমান করে দাঁড়িয়ে আছে জমিদারী বাড়ি, রাজকীয় মন্দির ও রাসমঞ্চ।

তথ্যসূত্রঃ

১। লক্ষ্মীজনার্দন মন্দির, পলাশী (ডেবরা), চিন্ময় দাশ, সব্যসাচী পত্রিকা, ২১.০৩.১৬

২। নুনের ব্যবসায়ী থেকে জনিদারীঃ পলাশী, নারায়ণ রুদাস

৩। পাঁশকুড়ার ইতিহাস ও ঐতিহ্য, রূপেশ কুমার সামন্ত

৪। ক্ষেত্রসমীক্ষা- ১৪.০৪.২৫

Friday, 8 November 2024

On the Way of the Evolution of Santali Culture

 

On the Way of Evolution of Santali Culture 

In the distant past, people of the Austric language group inhabited from northern India to Easter Island of the Pacific Ocean. Their noses are broad and flat, their complexions are black and their hair is wavy. They migrated from India to Australia approximately 30-40 thousand years ago. The descendants of that Austric group are called Santal.

     The Santals have strong adherence to social customs. Their own judicial system is extraordinary. The village Panchayet is made up of five foremen. They are Manjhi, Paranik, Jag Manjhi, Godet and Naike. Pargana Panchayet is formed by adding the foremen of some village Panchayet. Its head is called Pargana. The next larger system is the Desh Panchayet. Above these three tiers of judiciary system there is the La’bir or Supreme Court.

     Santal society is basically divided into 12 sections. They are Kisku, Hansda, Murmu, Hembram, Mandi, Soren, Tudu, Baske, Bedia, Besra, Pauria and Chonre. Handia is one of the drinks in the diet chart of Santals. Handia is a favorite drink of Santals. Dhoti and turban are quite popular as the general attire of Santals. Thick sarees are quite popular as girls wear. The Santals are festive people. Two types of festivals are generally seen: birth-death-marriage oriented festival and Parban oriented festival. Santals have their own language and their own religion. But there is no scripture. Santal society is rich in endless elements of folk culture. It is true that the Santal community has been nurturing the uniqueness of their traditions for thousands of years. But their traditions have been changed and evolved in many ways due to the invasion of modernity and other communities. 

Types of Santali Marriage

 

Types of Santali Marriage

Santali marriage is called ‛Bapla'. Santals are forbidden to marry within their same clan. In Santal society, marriage ceremony takes place in bride's house. Child marriage is not practiced in Santal society. In their society, an elder brother can never marry a younger brother's widow wife. The Santals have a custom of giving dowry to bride. This dowry is very small. The amount of this money is three rupees or seven rupees. Again there is a custom of paying sixteen or twenty one rupees.

The average age of marriage for a Santal boy is twenty and for a girl sixteen. There are seven types of marriage:

(1)   Kiring Bihu Bapla- This marriage is also called 'Duar Bapla'. If the boy is suitable for marriage, the burden of finding a bride is given to relatives and friends. The marriage is done by searching for a suitable bride and groom and negotiating a compromise. The daughter is to be brought home as a bride giving dowry.[1] The person who does this mediating work is called a Raibar or matchmaker. The matchmaker has to perform many responsibilities in the management of marriage.

(2)   Gardi Jawa Bapla - In this case, all the arrangements of marriage are made by the girl's father. He brings the boy to his house and has to stay and work for five years without pay. Then they marry and start a new married life.[1]

(3)   Kiring Jawa Bapla- In this case, the girl gets pregnant after engaging in sexual relations with a boy before marriage and neither the boy nor the girl agrees to marry. As a result, the girl inevitably has to marry another boy. In this case the first person has to bear all the dowry and other cost.[1] If the pregnant woman does not agree to disclose the name of the culprit, then a groom is required to be procured for her. If the groom is found in exchange of money and agrees to take care of the girl, they are married. If no groom is found, the future child gets Jag Manjhi's lineage.

(4)   Itut Sindur Bapla - In this case, the boy himself takes up the responsibility of marriage. If he likes a girl and doubts whether she will marry him, the boy forces the girl to wear Sindur. But in this case, a lot of inconveniences is created. In some cases, the marriage is recognized by resolution or penalty.[1]  According to social custom, once a boy puts Sindur or dust on a girl's Sinthi or forehead, then the girl is recognized as the boy's wife.

(5)   Inirbal Bapla - In this case, the girl herself takes up the matter of marriage. After living together, if the boy does not agree to marry the girl, the girl informs the Jag Manjhi of their village and he forcibly moves into the boy's house. If she can accept the torture of the boy's house and live for a while, then she has to be accepted as the wife of the house. Otherwise fine is levied.

(6)    Tunki Dipil Bapla- This type of marriage is held among the poor Santals. In this case the girl is brought to the house without any ceremony. Sindur is given to the girl.[1] The marriage ceremony is not also held at the bride's house.

(7)   Sanga Bapla- This type of marriage is for widows and divorced girls. A man marries the girl following few marriage customs. The dowry is halved in this case. Because according to Santal belief, this girl will be with her first husband again after death. And the second husband will get her only in this life.[1] There is no ceremony at this wedding. Only close relatives attend the wedding.

Thursday, 14 October 2021

আঠারো হাত দুর্গা- পাঁশকুড়ার অনন্য পুরাকীর্তি ফলক

 

আঠারো হাত দুর্গা- পাঁশকুড়ার অনন্য পুরাকীর্তি ফলক

©রূপেশ সামন্ত


দেবতারা নিজ নিজ বাসস্থান ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। মহিষাসুরের কাছে পরাজিত হয়ে দেবতার তখন চরম দুরবস্থার মধ্যে। তাঁরা প্রথমে ব্রহ্মার কাছে গেলেন। এরপর ব্রহ্মাকে সঙ্গে নিয়ে তাঁরা নারায়ণের কাছে গেলেন। সেখানে একই আসনে আসীন রয়েছেন শিব ও বিষ্ণু। তাঁরা দুই দেবতার নিকট মহিষাসুরের অত্যাচারের কাহিনী তুলে ধরলেন এবং সহায়তা প্রার্থনা করলেন। দেবতারা বললেন, ‘এখন আমরা আপনাদের শরণাপন্ন। আমাদের বিপদ থেকে রক্ষা করুন। না হলে আমাদের রসাতলে আশ্রয় নিতে হবে’। একথা শুনে ক্রুদ্ধ শংকর দাবানলের মতো রাগে জ্বলে উঠল। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর সহ সমস্ত ক্রুদ্ধ দেবতাদের মুখ থেকে বেরিয়ে এলো এক জ্যোতির্ময় তেজ। এই তেজোরাশি এক বিশাল পর্বতশৃঙ্গের আকৃতি নিল এবং কাত্যায়ন মুনির আশ্রমে একত্রিত হল। কাত্যায়ন মুনি নিজ তেজে সেই তেজোরাশিকে আরো শক্তিশালী করলেন। সেই তেজোরাশি থেকে আবির্ভূতা হলেন সহস্র সূর্যের মতো উজ্জ্বল অষ্টাদশভূজা দেবী কাত্যায়নী।

মহেশ্বরের তেজে কাত্যায়নীর মুখ, অগ্নির তেজে তিনটি চোখ, যমের তেজে চুল, হরির তেজে আঠারোটি হাত, চন্দ্রের তেজে স্তন, ইন্দ্রের তেজে শরীর মধ্যস্থান, বরুনের তেজে উরু-জঙ্ঘা-নিতম্ব, ব্রহ্মতেজে পা, সূর্য ও ইন্দ্রের তেজে কান, অশ্বিনীদ্বয়ের তেজে ভ্রু গঠিত হল।

শিব তাঁকে দিলেন ত্রিশূল, বিষ্ণু দিলেন সুদর্শন চক্র, বরুণ দিলেন শঙ্খ, অগ্নি দিলেন শক্তি, বায়ু দিলেন ধনুক, সূর্য দিলেন তূণীর, ইন্দ্র দিলেন বজ্র, কুবের দিলেন গদা, ব্রহ্মা দিলেন অক্ষমালা ও কমণ্ডলু, কাল দিলেন খড়্গ ও ঢাল এবং বিশ্বকর্মা দিলেন কুঠার ও অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্র। এইভাবে অস্ত্রসজ্জিতা হয়ে দেবী কাত্যায়নী সিংহ বাহিনী হয়ে চলে গেলেন বিন্ধ্য পর্বতে। হরিবংশ গ্রন্থে দেবী অষ্টাদশভূজাকে নিম্নরূপে বর্ণনা করা হয়েছে-

অষ্টাদশভূজা দেবী দিব্যাবরণভূষিতা।

হারশোভিতাসর্বাঙ্গী মুকুটোজ্জ্বলভূষণা।।

কাত্যায়নী স্তূয়সে ত্বং বরমগ্রে প্রযচ্ছসি।

     সেখানে চণ্ড ও মুণ্ড নামে অসুরদ্বয় তাঁকে দেখে তাঁর রূপে মুগ্ধ হয়ে তাদের রাজা মহিষাসুরের নিকট দেবীর অপরূপ রূপ বর্ণনা করেন। মহিষাসুর দেবীকে লাভ করবার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। দেবী জানান, ‘যে ব্যক্তি তাদের বংশের রমনীকে যুদ্ধে জয় করতে পারবে সেই তার পতি হবে’। মহিষাসুর মহিষের রূপ ধরে দেবীকে আক্রমণ করেন। দেবী তাঁকে তীব্র পদাঘাত করেন। এরপর দেবী অচৈতন্য মহিষাসুরের মস্তক ছিন্ন করলেন।

     ‘বামন পুরাণ’ পাঠ করলে এই কিংবদন্তীটি আমরা পাই। ‘বামন পুরাণে’র অষ্টাদশ, উনবিংশ ও বিংশ অধ্যায়ে এই কাহিনীর বিস্তৃত বিবরণ রয়েছে। কাত্যায়নী হলেন হিন্দু দেবী দুর্গার একটি বিশেষ রূপ। পৌরাণিক কাহিনী নির্ভর অষ্টাদশভূজা দুর্গার এই রূপটির অনন্য সাধারণ পোড়ামাটির ফলক রয়েছে মাইশোরার মাংলইয়ের রাধাদামোদরজিউ মন্দিরে। মন্দিরের দেওয়ালের অসংখ্য টেরাকোটা ফলকের মধ্যে এই বিশেষ ফলকটি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেই। এই মন্দিরের দুই দিকে বিস্ময়কর ভাবে ঘিরে রয়েছে দু’টি শিব মন্দির। ©রূপেশ সামন্ত

[এ সম্পর্কিত আরও বিস্তৃত তথ্য সম্বলিত আমার লিখিত পুস্তক আসছে খুব শীঘ্রই। আপনারা অনুসরণ করতে পারেন। দয়া করে কেউ কপি-পেস্ট করবেন না। ভালো লাগলে শেয়ার করুন।]

Tuesday, 31 August 2021

অপমানের জবাব দিতেই রাতারাতি তৈরি পাঁশকুড়ার প্রথম ছাপাখানা- History of Panskura

 

অপমানের জবাব দিতেই রাতারাতি তৈরি পাঁশকুড়ার প্রথম ছাপাখানা

©রূপেশ সামন্ত


পুস্তকঃ “পাঁশকুড়ার স্বাধীনতা আন্দোলন ও রাজনৈতিক বিবর্তন”, লেখকঃ © রূপেশ সামন্ত

পাঁশকুড়ার এক ও অদ্বিতীয় ছাপাখানা ছিল সেটি। তৈরি হয়েছিল রাতারাতি। এক রজনীতে তৈরি হয়েছিল বলে নাম হয়েছিল ‘রজনী প্রেস’। পাঁশকুড়া স্টেশন বাজারের খিরিশতলার কাছে সেই প্রেসের পরিচিতির বিস্তার হলেও তার সৃষ্টি কিন্তু রাধাবল্লভচক গ্রামে। সেই ছাপাখানার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী রাখালচন্দ্র নায়ক। তিনি আগস্ট আন্দোলনকে সামনে রেখে রাসগাছতলায় যখন জমায়েত ও সভা করেছিলেন, তখন ব্রিটিশ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। বিচারে এক বছরের কারাদণ্ড হয়। এছাড়াও ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন চলাকালে কংগ্রেস পরিচালিত ‘বেঙ্গল ভলিউন্টারি’র সদস্য হিসাবে বাংলাদেশের ঢাকায় ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে গিয়েছিলেন। গ্রেপ্তার হয়ে জেলও খেটেছিলেন। ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৫২ সাল নাগাদ পাঁশকুড়া-১ ব্লকের রাধাবল্লভচক গ্রামের নিজের বাড়িতেই গড়েছিলেন ‘রজনী প্রেস’। পশ্চাতে রয়েছে এক রজনীতে ছাপাখানা তৈরির উপাখ্যানও।

     তৎকালীন সময়ে প্রেস বা ছাপাখানার কাজ হত মূলত তমলুকে। উল্লেখ্য, রাখালবাবু কলকাতায় কিছুদিন প্রেসের কর্মী হিসাবেও কাজ করেছেন। তিনি একদিন একটি বিল-বই ছাপানোর প্রয়োজনে তমলুকের একটি প্রেসে গিয়েছিলেন। সেখানে চারটাকা মূল্যের ছাপা-কাজের জন্য দশটাকা চেয়েছিল। রাখালবাবু প্রতিবাদ করায় তাঁকে প্রচুর অপমান করা হয়। সেই অপমানের জবাব দিতেই সেই রাতেই বাড়িতে গড়েছিলেন হস্তচালিত ছাপাখানা। এক রাতে বা এক রজনীতে তৈরি হওয়া প্রেসের নাম দিলেন ‘রজনী প্রেস’। স্বল্প খরচে গুনমান সম্পন্ন ছাপার কাজ হওয়ায় প্রেসটির ব্যবসায়িক সাফল্য চূড়ান্ত ছিল। উল্লেখ্য, যতদূর জানা যায়, ‘রজনী প্রেস’ হল ব্যবসায়িক ভিত্তিতে তৈরি পাঁশকুড়ার প্রথম প্রেস। পরবর্তীকালে প্রেসটি হস্তান্তরিত হয়ে পারিবারিক অন্য সদস্যের হাত ধরে পাঁশকুড়ার খিরিশতলায় স্থানান্তরিত হয়। সেই প্রেসের অস্তিত্ব আজ আর নেই।

     ইতিপূর্বে পরাধীন ভারতে বিংশ শতকের তিরিশ-চল্লিশের দশকে পাঁশকুড়ার স্বাধীনতা সংগ্রামীদের দ্বারা এখানকার দু’টি গ্রামে বুলেটিন ছাপার কাজ হত। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের প্রচার ও প্রসার করতে সংবাদ বুলেটিন প্রকাশ অত্যন্ত গূরুত্বপূর্ণ ছিল। এক্ষেত্রে পাঁশকুড়ার জোড়াপুকুর ছিল ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনকারীদের অন্যতম ঘাঁটি। জোড়াপুকুরে শ্যামাদাস ভট্টাচার্যের বাড়িতে গোপনে সাইক্লোস্টাইল যন্ত্রে বুলেটিন ছাপা হত। পাঁশকুড়ার বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী ইন্দুমতি ভট্টাচার্যের পুত্র কালিদাস ভট্টাচার্য জোড়াপুকুরের বাড়িতে অনেক দিন বুলেটিন ছাপার কাজ করেছেন। পাঁশকুড়ার প্রত্যন্ত কালিদান গ্রামেও সাইক্লোস্টাইলে বুলেটিন ছাপার কাজ হয়েছে। ব্রিটিশ পুলিশের চোখে ধূলো দিতে সাইক্লোস্টাইল যন্ত্র এক বাড়িতে বেশিদিন রাখা হত না। এইসব গোপন কার্যকলাপের বিরুদ্ধে ইন্দুমতি ভট্টাচার্যের বাড়িতে পুলিশি অভিযানও হয়েছে। ‘স্মৃতিকনা’য় ইন্দুমতি দেবী তেমনই এক পুলিশি অভিযানের কথা লিখেছেন, ‘হঠাৎ দেখি অনেক লাল-পাগড়ি পরা পুলিশভর্তি একটা মোটর গাড়ি রাস্তায় থামল। ... ... ...

 

(আরও জানতে উৎসাহী পাঠকেরা নিম্নলিখিত পুস্তকটি অনুসরণ করতে পারেন। কেউ কপি-পেস্ট করবেন না। ভালো লাগলে শেয়ার করতে পারেন।)

পুস্তকঃ “পাঁশকুড়ার স্বাধীনতা আন্দোলন ও রাজনৈতিক বিবর্তন”

লেখকঃ © রূপেশ সামন্ত

প্রাপ্তিস্থান- দীপিকা বুক স্টল, পাঁশকুড়া স্টেশন।

For Online Booking, Whatsapp- 9153099507

Monday, 14 June 2021

ওরা ‘হো’রা- ভালো নেই ওরা! Tribal Ho

 

ওরা ‘হো’রা- ভালো নেই ওরা!

© রূপেশ সামন্ত

 
















     ‘কেমন আছেন?’ এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম এক বিধবা রমনীকে। তিনি মালতী সিরকার। বয়স বড়জোর তিরিশ। মুখ নিচু করে মাটির দালানে বসেছিল মালতী। মুখে কোন সাড়াশব্দ নেই দেখে এগিয়ে এলেন গুরুপদ বাবু। পুরো নাম গুরুপদ পূর্তি। আদিবাসী হো সম্প্রদায় থেকে উঠে আসা একজন প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক। তিনি জানালেন, ‘মালতীর স্বামীর মাদকাসক্ত হয়ে মারা গেছে খুব অল্প বয়সে’। তিনি আরও জানালেন, ‘এখানকার অল্প বয়সী বহু যুবক মদ খেয়ে খেয়ে অসুস্থ হয়ে মারা যায়। গতবছর আমাদের ক্লাবের পক্ষ থেকে অভিযান চালিয়ে প্রায় ২০টি মদের ভাটি ভাঙা হয়েছে। তবুও রোখা যায়নি এই সর্বনাশা নেশা’। শুধু মিতালী সিরকার নয়, সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল মালতী সিরকার। বয়স বড়জোর পঁয়ত্রিশ। সেও স্বামীহারা। তার পোষাকে দারিদ্রতার ছাপ স্পষ্ট। এমন অনেক মিতালী-মালতীরা আজ সন্তান-সন্ততি নিয়ে অসহায়!

     ‘কোন ক্লাসে পড়াশোনা করো তুমি?’ এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম একটি শিশুকে। সে রূপকুমার মাণ্ডি। বয়স বড়জোর আট বছর। অন্যান্য শিশুদের সাথে ‘পাতালুকানি’ খেলছিল। আমার প্রশ্নে তার মুখটা শুকিয়ে গেল। এমন সময় এগিয়ে এলো স্নেহাশিষ। পুরো নাম স্নেহাশিষ হেমরম। এখানকার চরম অশিক্ষার অন্ধকারের মাঝে স্নেহাশিষ গর্বের ছেলে। সে এডুকেশন বিষয়ে পোস্টগ্র্যাজুয়েট ও বি.এড. ডিগ্রী ধারী। একটা চাকরি পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। স্নেহাশিষই জানালো, ‘স্যার, ঐ ছেলে গুলো কেউ পড়াশোনা করে না। স্কুলে যায় না। নূন্যতম অক্ষর জ্ঞানটুকুও ওদের নেই’। সে আরও বলল, ‘আর কিছুদিন পর ওরা দিনমজুরির কাজে চলে যাবে, নেশাভান করবে’। ঘরের কাছে প্রাইমারি স্কুল থাকলেও এরকম বহু রূপকুমারই স্কুলের মুখ দেখেনি। আর ওদের এগিয়ে দেওয়ারও কেউ নেই। শিক্ষার আলোকিত জগৎ ওদের কাছে আজও অধরা।

     এই দুটি ঘটনাই পূর্ব মেদিনীপুর জেলার পাঁশকুড়া ব্লকের হাউর অঞ্চলের আমদান গ্রামের। এই গ্রামে আদিবাসী হো, সাঁওতাল, কোল, মুণ্ডা, ভূমিজ সম্প্রদায়ের প্রায় ১৪০টি পরিবারের বাস। আদিবাসো জনসংখ্যা প্রায় ৭০০ জন। ওদের পাশে থাকার দুনির্বার আকর্ষণে ওদের মাঝে হাজির হই বারে বারে। আন্তরিক সম্পর্কের গভীরতা দিয়ে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছি সমস্যার শিকড়ে। অকপট স্বীকারে দ্বিধা নেই, স্বাধীনতা লাভের ৭৫ বছরের দোরগোড়ায় এসে শিক্ষা আজও ‘সকলের শিক্ষা’ নয় ওদের কাছে। ‘সবার শিক্ষা’ আজ বড্ড বেশি প্রয়োজন ওদের। পারিবারিক আর্থিক দুর্দশায় বাড়ির বড়রা সারাদিন দিনমজুরিতে ব্যস্ত। পড়্রাশোনা চুলোয় যাক! বাড়ির বড়রাও চায় শিশুহাত গুলোও তাদের আর্থিক উপার্জনের সহযোগী হোক। আজও হো সমাজে অন্তঃসলিলা প্রবাহিত হয় কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস। অশিক্ষা থেকে জন্ম নিচ্ছে বিশৃঙ্খল জীবন। অবহেলা স্বাস্থ্যে, অবহেলা সংস্কৃতিতে। পানীয় জল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, স্কুল সবই রয়েছে সরকারি আয়োজনে। শুধু যোগসূত্র স্থাপনের অভাব। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে?

    অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার কংসাবতী-সুবর্ণরেখা অববাহিকাতে প্রাগৈতিহাসিক মানব সভ্যতার বিকাশ ও বিবর্তণ ঘটেছিল। সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগেই অস্ট্রো-এশিয়টিক জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা এতদাঞ্চলে নদী মাতৃক ও কৃষি-শিকার ভিত্তিক সভ্যতার সূচনা করেছিল। তাদের উত্তসূরীরা আজ ভালো নেই। ক্ষুদ্র সামর্থ্য নিয়েই ওদের সামনে হাজির হয়েছিলাম অন্য দিনের মতোই। তবে একটু আলাদা স্বাদ নিয়ে। দরিদ্র পরিবারের শিশুদের একদিনের ভরনপোষনের দায়িত্ব নিয়েছিলাম। ওদের একটু আলাদা জীবন উপহার দেওয়ার তাগিদ থেকেই। শিশুরা দুপুরের আহারে ভাত, ডাল, সবজি, মুরগী মাংস, চাটনি, দই ও পাপড় পেয়ে উপহার দিয়ে গেল শত গোলাপের হাসি। নতুন জামা প্যান্ট পাওয়া সবচেয়ে ছোট্ট শিশুটির হাসিমুখ দেখে মনে পড়ে গেল Oscar Wilde এর লেখা গল্প ‘The Selfish Giant’-র ছোট্ট শিশুটির কথা। গল্পের শেষে শিশুটি বলছে, “You let me play once in your garden; today you shall come with me to my garden, which is paradise.” অনেক ‘ভালো নেই’ এর মাঝে অনুভূতিটা সত্যিই স্বর্গীয়! হলোই বা ক্ষণিকের!

© রূপেশ সামন্ত

 

সংবাদ প্রতিবেদন-১

https://www.facebook.com/101248021405457/posts/336257194571204/

সংবাদ প্রতিবেদন-২

https://fb.watch/660O9qMfhI/

বাংলাদেশের ভারত বিরোধিতা: আবেগ না রাষ্ট্রবুদ্ধি?

বাংলাদেশের ভারত বিরোধিতা: আবেগ না রাষ্ট্রবুদ্ধি? ✍️ রূপেশ কুমার সামন্ত  বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে সাম্প্রতিক কালে ভা...