Showing posts with label Essay_Bengali. Show all posts
Showing posts with label Essay_Bengali. Show all posts

Friday, 9 May 2025

বাংলাদেশীদের এই ভারত বিদ্বেষ কাম্য নয়

 সেদিন ভারত ছিল প্রথম রাস্ট্র, যারা বাংলাদেশকে প্রথম স্বাধীন রাস্ট্রের স্বীকৃতি দিয়েছিল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাংলাদেশের মানুষের আত্মপরিচয় রক্ষার একটি রক্তাক্ত সংগ্রাম। সেদিন বাংলাদেশের অবর্ণনীয়  বিপর্যয়ে পাশে দাঁড়িয়ে ছিল একমাত্র ভারত।


সেদিন বাংলাদেশের প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ শহীদ হন (সরকারি হিসাব)। 


২ থেকে ৪ লক্ষ নারী পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধর্ষণের শিকার হন। 


১ কোটিরও বেশি মানুষ ভারতে আশ্রয় নেয়, যারা উদ্বাস্তু জীবন যাপন করে দীর্ঘদিন।


শিল্পকারখানা, রেলপথ, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ অধিকাংশ অবকাঠামো পূর্ব-পরিকল্পিত ভাবে ধ্বংস করে দেয় পাকিস্তান, যাতে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশ পুনর্গঠনে বেকায়দায় পড়ে। 


বুদ্ধিজীবী নিধনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ভবিষ্যতের নেতৃত্বশূন্য করার চেষ্টা করা হয়।


সেদিন বাংলাদেশের বিপর্যয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভারত লড়াই করেছিল। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানের পরাজয় সূচিত হয়। ভারতের হাতে বন্দী হয় পাকিস্তানের ৯৩ হাজার সৈন্য। বাংলাদেশকে স্বাধীন রাস্ট্র রূপে ঘোষণা করা হয়।


কিছু নিন্দুক এখনও নির্লজ্জ ভাবে বলে চলেছে, সেদিন ভারত নাকি নিজেদের স্বার্থেই বাংলাদেশের হয়ে লড়াই করেছে। তাহলে প্রশ্ন একটাই, সেদিন পাকিদের দ্বারা চার লাখ বাংলাদেশি মা-বোনের ধর্ষন আর ৩০ লাখ নরহত্যার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের কোন স্বার্থ ছিল না?


Gary J. Bass এর লেখা একবার পড়লেই পাকিদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের লোম খাড়া হয়ে যাওয়া উচিৎ। তাঁর লেখা “The Blood Telegram” গ্রন্থে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর যৌন সহিংসতার মাত্রা বর্ণনায় বলা হয়েছে যে: “Some women were raped dozens of times, even as much as 70 or 80 times...”


সেদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পরও বাংলাদেশে বসেই পাকিস্তান পন্থী মিডিয়াগুলো রেডিওয় নির্লজ্জ ভাবে প্রচার করে যাচ্ছিল, পাকিস্তান নাকি একের পর এক ভারতের কলকাতা, আসাম, ত্রিপুরা দখল করে নিচ্ছে! বড্ড হাস্যকর। 


পাকিস্তান পন্থী মিডিয়াও সেদিন পাকিস্তানকে বাঁচাতে পারেনি। সেদিন পাকিস্তানের জেনারেল নিয়াজি ভারতের জেনারেল জগজিত সিং অরোরার সামনে মাথা নত করে আত্মসমর্পনের দলিলে স্বাক্ষর করেছিল। নিজেদের মা-বোনেদের ধর্ষণকারী, গনহত্যাকারী পাকিদের পক্ষ নেওয়ার পূর্বে একটু অন্তত লজ্জিত হও, বাংলাদেশী মিডিয়া (কিছু)।


© রূপেশ সামন্ত


Wednesday, 27 January 2021

জন-সুনামিতে বিধ্বস্ত পাঁশকুড়ার ফুলের উপত্যকা Panskura Flowers Valley in Danger

 

জন-সুনামিতে বিধ্বস্ত পাঁশকুড়ার ফুলের উপত্যকা

©রূপেশ সামন্ত

     লাঠি নিয়ে তেড়ে এলো এক চাষী বৌ। ‘কি ব্যাপার?’ জিজ্ঞাসা করায় উগরে দিল একরাশ ক্ষোভ, ‘সবাই ফুল বাগানে ঢুকে ফটো তুলছে। আর গাছ গুলো সব ভেঙে দিচ্ছে। সারাদিন জেগে বসে আছি’। জিজ্ঞাসা



করলাম, ‘বাড়ির কর্তা কোথায়’? উত্তর দিলেন, ‘আমরা পালা করে বাগান জাগি’। আমি বললাম, ‘ফুল বিক্রিও তো বেশ হচ্ছে’! সোজা উত্তর দিলেন, ‘সে হলে তো এক কথা ছিল! কম লোকই ফুল কিনে। বেশির ভাগই ঘুরতে আসে। আর ফুল ব্যবসায়ীরাও তো ব্যবসা করছে’।

     একের পর এক জন-সুনামি আছড়ে পড়ছে পাঁশকুড়ার ফুলের উপত্যকায়। সদর ঘাটের ব্রীজ থেকে গাড়ির লম্বা লাইন। ব্যাপক যানজট। সারা রাজ্য থেকে দর্শকরা ছুটে আসছে মল্লিকা, গাঁধা, গ্লাডিওলাস, মুরগাই ইত্যাদির রূপ-রস দু’চোখ ভরে শুষে নিতে। কিন্তু এই বিপুল জন সমাগম নিয়ন্ত্রনের পরিকাঠামো কোথায়?

     [১] বাগানের মধ্যে সরু সরু আল ধরে ঢুকে পড়ছে হাজার হাজার দর্শক। পদপিষ্ট হয়ে অকালে প্রাণ হারাচ্ছে নিরীহ গাছগুলি।

     [২] বাগানের মধ্যেই ঢুকে পড়ছে অবাধ্য সেলফি শিকারীরা। ফলে অঘোরে প্রাণ যাচ্ছে বা অঙ্গ-বিচ্যুতি হচ্ছে দুর্বল গাছ গুলির।

     [৩] বাগানের মধ্যে একটু ফাঁকা জায়গা পেলেই চলছে পিকনিক। প্লাস্টিক আর বর্জ্য খাবারে গাছগুলির প্রাণ ওষ্ঠাগত।

     [৪] মানুষের বিনোদন নিবারণে বাগানের মধ্যেই যেথসেথা বসে গেছে দোকান-পাট। বানিজ্য মূখ্য! কৃষি উৎপাদন গৌন!

     [৫] নদীর পাড় সাফ করে বানিজ্য-বিনোদনের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র করে ফেলা হয়েছে। চুলোয় যাক বাস্তুতন্ত্র!

     [৬] বাগানের পাশ দিয়েই গেছে রেললাইন। বেপরোয়া দর্শকদের জন্য বিপদের হাতছানি রয়েছে সবসময়।

     [৭] যান নিয়ন্ত্রন ও পার্কিংয়ের কোন ব্যবস্থা নেই। ফুলের উপত্যকায় যাত্রাপথ সত্যিই দীশাহীন।

     [৮] পানীয় জলের ব্যবস্থা, যাত্রী সাচ্ছন্দ্য, বর্জ্য নিস্কাশনের ব্যবস্থা অপ্রতুল। ফুলের রাজ্যে দূষণ বড্ড বেমানান!

 



     প্রয়োজন সুসংহত পরিকল্পনা। পরিবেশ বান্ধব পরিকল্পনা ও তার রূপায়ন ছাড়া এইভাবে চলতে থাকলে ফুলের উপত্যকা খুব শীঘ্রই মরুভূমি উপত্যকায় পরিনত হবে। এগিয়ে আসতে হবে সরকার, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সাধারন মানুষকে। অবশ্যই ধন্যবাদ প্রাপ্য দোকাণ্ডা গ্রামবাসীর। তাঁরা নিজ উদ্যোগে ফুল বাগান বাঁচানোর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

     [১] ফুলবাগান এলাকায় যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করা উচিত। ফুলবাগান থেকে অন্তত এক কিলোমিটার দূরে পার্কিং স্থান করা উচিত।

     [২] ফুলবাগান চত্ত্বরে বন্ধ হোক সমস্ত রকম পিকনিক এবং খাওয়া-দাওয়া।

     [৩] ফুলবাগানে প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগ, প্লাস্টিকের জলের বোতল ও শুকনো খাবার বহন নিষিদ্ধ হোক।

     [৪] ফুলবাগান চত্ত্বরে মেলা ও দোকান-পাট বন্ধ করা হোক। কেবলমাত্র চাষীদের ফুল বিক্রীর জন্য চাষীদের মালিকানাধীন কিছু পরিবেশ বান্ধব দোকান বানানো হোক।

     [৫] ফুলবাগানকে কেন্দ্র করে ঋতুকালীন ফুল-বিনোদন মেলা পি.ডব্লিউ.ডি মাঠে করা যেতে পারে।

     [৬] ফুল বাগান চত্ত্বরে পানীয় জল, দর্শকদের বসার আসন, হোম-স্টে ইত্যাদি পরিবেশ বান্ধব রূপে গড়ে তোলা প্রয়োজন।

     [৭] বাগানের মধ্যে দর্শকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হোক। দূর থেকে বাগান দেখার পরিকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

     [৮] এলাকাটিকে ‘সংরক্ষিত’ ঘোষনা করা উচিত। ফুলের উপত্যকার উন্নয়নে ফুল চাষী, সরকারী প্রতিনিধি ও গুনীজনদের নিয়ে একটি উন্নয়ন কমিটি গড়ে তোলা অবিলম্বে প্রয়োজন।





     আসুন। ফুলের উপত্যকা বাঁচাতে এগিয়ে আসুন। মতামত ব্যক্তিগত। সুপরামর্শ কাম্য।

©রূপেশ সামন্ত

কপি-পেস্ট করবেন না। প্রয়োজনে শেয়ার করুন।


















 





Sunday, 13 September 2020

তাল

 

আহা! তাল

©রূপেশ সামন্ত




 

দেবের দুর্লভ ধন জীবনের ঘড়া

এক বিন্দু রস খেলে বেঁচে ওঠে মড়া।

     লিখেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত। রস পাগল মানুষদের দেখলে কবিতার সারমর্ম উপলব্ধি হয়। তালরস থেকে খেজুররস বাঙালী হৃদয়ে চিরকালই দোলা দেয়। খেজুর কুল থেকে খেজুরের রসে যেমন শীতকাল ‘ম’ ‘ম’ হয়ে ওঠে, তেমনি তালরস থেকে তালপাঁকিতে গ্রীষ্ম থেকে বর্ষা জীভ জলময় হয়ে ওঠে। তালরস থেকে তালগুড়, তালমিছরি, তাড়ি নানারকম দ্রব্য তৈরি হয়। এগুলির মধ্যে তাড়ি এক বিষম বস্তু! আবার অতি চাহিদারও বস্তু! গ্রীষ্মকালে গ্রামে-গঞ্জে জাঁকিয়ে বসে তাড়ি তৈরির কারখানাও! তাই কবিতা প্রেমিক বলদেব সাঁতরা কবিতায় লেখেন-

রসের ও লাগিয়া, হাঁড়ি গাছে পাতিয়া --

ধরিব শীতল জল বিন্দু।

তোমার কাছে আছে কি খোঁজ বন্ধু,

কেমনে জুটিবে এমন সুধা সিন্ধু?”

     রসবন্ধু বেরা নামে এক রেল কর্মচারী ছিল। তিনি সখের তালবাগান করেছিলেন। রসভক্ত রসবন্ধু তালরস পান না করে দাঁত মাজতেন না! প্রতিদিন সকালে অফিস যাওয়ার সময় দু’চার বোতল রস সঙ্গেও নিয়ে নিতেন। তালরসে অফিসের বসও বশীভূত! আবার অফিস ফেরৎ হয়ে তালরস পান না ডিনার করতেন না! রসেবসে রসবন্ধু ভালোই ছিলেন! ধীরে ধীরে খরিদ্দারও হতে লাগলো! রসবন্ধুর নাম হয়ে গেল তাড়িবন্ধু! সেই তাড়ি একসময় রসবন্ধুকে তাড়া করে বেড়ালো তাড়ির সঙ্গে আর আড়ি করতে পারলেন না! একদিন শুনলাম, চাকুরি জীবন শেষ করার পূর্বেই অতিরিক্ত তাড়ি পানের তাড়নায় মারা গেছেন তাড়িবন্ধু! কবিতা প্রেমিক বলদেব বাবু উপসংহার টানলেন-

এরকম লোকের আজকে খুবই অভাব। রসের প্রকৃত রসবোধ এমন জীবন রসিকরাই জীবন দিয়ে উপলব্ধি করতে পারে বাকিরা চুমুকেই ডিগবাজিস্বাদ কি বুঝিবে, গন্ধেই মরিয়া গেল। ©রূপেশ সামন্ত


     এ তো গেল রসকথা। রসে যেমন বাঙালি মাতাল, পাকা তালে তাল ঠিক রাখাটাও বাঙালির কাছে মুস্কিল! পাকা তালের গন্ধে মনটা উসখুস করে উঠবেই। তালের রুটি, তালের পরোটা, তালের নানান পিঠা, তালের পায়েস সবই বাঙালির নিজস্ব সৃষ্টি। ভাদ্রমাস মানেই ঘরে ঘরে তালের বড়া, তালের পুরপিঠা, তালের পোড়াপিঠা হবেই। ফলে তালের চাহিদা ক্রম বর্ধমান। যে তাল আগে রাস্তঘাটে পড়ে থাকতো, তাই এখন বাজারে ৩০টাকা দরে বিক্রী হয়। আসলে সবের পেছনেই সেই রসনাপ্রেম। তালরস থেকে তালপাঁকি- রসাস্বাদন থেকে পিঠাস্বাদন- রসনাপ্রেমিদের জীবনকে অন্য আঙ্গিকে দেখার অভিপ্রায়েই কিনা!

©রূপেশ সামন্ত

[দয়া করে কপি-পেস্ট করবেন না। শেয়ার করুন।]


 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 


Saturday, 13 April 2019

বাংলার চৈত্র মাসঃ বাঙালীর গাজন মাস

------- ----- ---বাংলার চৈত্রমাসঃ বাঙালীর গাজন মাস--- ----- -------
     নীল পুজোর দিন গ্রামবাংলার মহিলারা কেন নীলব্রত পালন করেন? গাজনের সন্ন্যাসীরা কেনই বা জিভে লোহার শিক গেঁথে, ভাঙা কাচের টুকরোর ওপর হেঁটে, আগুনে বা বঁটির উপর ঝাঁপ দিয়ে শারীরিক কষ্ট স্বীকার করে?  কেনইবা চড়ক গাছ থেকে পিঠে বঁড়শি গেঁথে দড়ি দিয়ে মানুষকে ঝুলিয়ে উৎসব পালন হয়? অনেক কৌতুহল। লোক-সংস্কৃতির ইতিহাসে একটু উঁকি-ঝুঁকি দিলেই কারণ গুলো জানা যায়। আসলে, গাজন একটি হিন্দু লোকউৎসব। কিন্তু গাজন উৎসব কে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত গাজন মেলায় সর্ব-ধর্মের মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠান এক সার্বজনীন রূপ নেয়। চৈত্র মাসের শেষ সপ্তাহ জুড়ে শিবের গাজন অনুষ্ঠিত হয়। ছড়া গানের মধ্যেও রয়েছে শিবের গাজন- ‘আমরা দুটি ভাই শিবের গাজন গাই।/ ঠাকমা গেছেন গয়া কাশী ডুগডুগি বাজাই।’ গাজন উৎসবের মূলত তিনটি অংশ— ঘাট-সন্ন্যাস, নীলব্রত ও চড়ক।
-----ঘাট-সন্ন্যাস-----
     অতীতে চৈত্রের প্রথম দিন থেকেই ভক্তরা সন্ন্যাস পালন করতেন। বর্তমানে চৈত্র সংক্রান্তির সাত দিন আগে, কোথাও বা তিন দিন আগে থেকে কঠোর নিয়ম নিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ঘাট-সন্ন্যাস পালন করা হয়। ঐ ক’দিনের সন্ন্যাস পালন অত্যন্ত কঠিন। গেরুয়া বস্ত্র ধারণ করতে হয়। ব্রতধারী সন্ন্যসীদের হবিষ্যি গ্রহণ করতে হয়। এক জন প্রধান সন্ন্যাসী থাকেন। এখন অনেক মহিলারাও সন্ন্যাসিনী হন। যাইহোক, বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে গাজন উৎসব এর আঞ্চলিক বৈচিত্র বেশ লক্ষ্যনীয়। সন্ন্যাসীদের মুখোশ নৃত্য আর সঙ সাজা একটি অন্যতম দিক। সন্ন্যাসীরা শিব ও গৌরী সেজে এবং অন্যান্যরা নন্দী, ভৃঙ্গী, ভূতপ্রেত, দৈত্যদানব প্রভৃতির সঙ সেজে নৃত্য করতে থাকেন। নানা লৌকিক ছড়া আবৃত্তি ও গান করতে থাকেন। ব্রতধারী সন্ন্যসীরা শিবের পুজোর ফুল গ্রহণ করে প্রতীকী শিবলিঙ্গ নিয়ে ঢাক, ঢোল, কাঁসর, বাজনা বাজিয়ে গ্রাম পরিক্রমায় বের হন। মুখোশ নৃত্যে ফুটে ওঠে পৌরানিক গল্পের নানা চরিত্র, দেব-দেবী, রাক্ষস, পশু ইত্যাদি। গাজনের সন্ন্যাসীরা নিজেদের শরীরকে বিভিন্ন উপায়ে যন্ত্রনা দিয়ে কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে ইষ্ট দেবতাকে সন্তোষ প্রদানের চেষ্টা করেন। এ ছাড়াও হয় কালীনাচ। কালী সেজে, মুখোশ পরে নাচকে বলা হয় কালীনাচ। গাজন সাধারণত তিনদিন ধরে হয়। এই উৎসবের সঙ্গে মেলা অপরিহার্য।
-----নীল পূজা-----
     নীল পূজা পালিত হয় গাজনের পরের দিন তথা চড়কের আগের দিন। বাঙালি গৃহিণীরা নিজের সন্তান এর মঙ্গল কামনায় নীরোগ সুস্থ জীবন কামনা করে নীলষষ্ঠীর ব্রত পালন করে চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন। জনশ্রুতি অনুসারে, এক বামনী অতি ভক্তি সহকরে সমস্ত ব্রত করতেন। কিন্তু তাঁর একটিও ছেলে মেয়ে বাঁচতো না। তারপর মনের দুঃখে সব ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে কাশী চলে যান। একদিন কাশীতে যখন ঘাটের ওপর বসে মনের দুঃখে কাঁদছিলেন, তখন মা ষষ্ঠী বুড়ি বামনীর বেশ ধরে এসে তাদের জিজ্ঞেস করেন, “কাঁদছিস কেন?” বামনী বললে, “আমার পাঁচটি ছেলে আর একটি মেয়ে ছিল, কিন্তু সব ক’টাই মরে গেল। সব বার–ব্রত, ঠাকুর দেবতা মিথ্যে।” মা ষষ্ঠী জিজ্ঞাসা করলেন, “তোরা কি নীল ষষ্ঠী করেছিস?” বামনী বললে, “ও ব্রত তো আমি জানি না।” তখন মা ষষ্ঠী বললেন, “সমস্ত চৈত্র মাস সন্ন্যাস করে শিব পুজো করবে, তারপর সংক্রান্তির আগের দিন উপোষ করে সন্ধ্যার সময় নীলকণ্ঠ শিবের ঘরে বাতি জ্বেলে দিয়ে, মা ষষ্ঠীকে প্রণাম করে তবে জল খাবে।” এই কথা বলে মা ষষ্ঠী অদৃশ্য হয়ে গেলেন। তারপর বামনী দেশে ফিরে গিয়ে খুব ভাল করে নীল ষষ্ঠীর পুজো করল। এরপর তাদের যতগুলো ছেলেমেয়ে হল, সবাই বেঁচে রইল। ব্রত-আচার অনুযায়ী, গৃহিনীরা সারাদিন উপোষ করে সন্ধ্যায় শিবের মাথায় পাঁচটি আকন্দ ফুল, সিদ্ধি, গাঁজা, দুধ মিশ্রিত গঙ্গাজল ঢেলে ঘীয়ের প্রদীপ জ্বেলে শিবকে প্রনাম করে জল খায়। এ দিন গাজনের সন্ন্যাসীদের ফল, আতপ চাল, অর্থ দান করা হয়। রাতে নীল পূজার পর সন্ন্যাসীরা উপোষ থাকেন। পরদিন বিকেলে চড়ক পূজা শেষেই উপোষ ভাঙেন তারা।
-----চড়ক পূজা-----
      চৈত্র মাসের শেষ দিনে উদ্‌যাপিত হয় চড়ক উৎসব। সারা বছর ধরে চড়ক গাছকে শিবমন্দিরের কাছের কোনও পুকুরে ডুবিয়ে রাখা হয়। সেই পুকুর ‘শিবপুকুর’ নামে পরিচিত। চড়কের দিন গাছটিকে তুলে আনা হয় মন্দিরের সামনে। তার পর, চড়কগাছ পুজো করে তা মাঠের মাঝে পোঁতা হয়। এর পরে শুরু হয় চড়ক অনুষ্ঠান। সঙ্গে চলে বিরাট মেলা। চড়ক গাছ থেকে পিঠে বঁড়শি গেঁথে দড়ি দিয়ে সন্ন্যাসীকে ঝুলিয়ে দিয়ে ক্রমাগত ঘুরপাক খাওয়ানো হয়। ঘুরপাক খেতে খেতে সেই সন্ন্যাসী নীচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের উদ্দেশে ছুড়ে দেন বাতাসা, ফল ইত্যাদি। সন্ন্যাসীর আর্শীবাদ লাভের আশায় শিশু সন্তানদেরও শূন্যে তুলে দেওয়া হয়। সন্ন্যাসীরা ঘুরতে ঘুরতে শিশুদের মাথায় হাত দিয়ে আর্শীবাদ করেন। সন্ন্যাসীদের বিশ্বাস, জগতে যারা শিব ঠাকুরের কৃপা লাভের জন্য স্বেচ্ছায় এত কঠিন আরাধনার পথ বেছে নিয়েছে, বিনিময়ে পরলোকে শিবঠাকুর তাদের স্বর্গে যাওয়ার বর দেবেন।
-----গাজনের ইতিহাস-----
১. গবেষকদের মতে, ‘গাজন’ শব্দটি ‘গর্জন’ শব্দ থেকে ব্যুৎপন্ন হয়েছে। এই উৎসবে অংশগ্রহণকারী সন্ন্যাসীরা প্রচণ্ড গর্জন করেন বলে উৎসবের নাম গাজন। অন্য গবেষকদের মতে, ‘গা’ শব্দের অর্থ ‘গ্রাম’ এবং ‘জন’ শব্দের অর্থ ‘জনগন’। গ্রামীণ জনগনের উৎসব হওয়ায় এই উৎসবের নাম গাজন।
২. বিশ্বাস মতে, গাজন উৎসবের সময় দেবী হরকালীর সঙ্গে শিবের বিবাহ হয়। সন্ন্যাসীরা ঐ উৎসবে বরযাত্রী হিসেবে অংশ নেন।
৩. গাজন নিয়ে ভারতকোষকার বলেছেন, “… প্রকৃতপক্ষে এই উৎসবের লক্ষ্য সূর্য এবং তাহার পত্নী বলিয়া কল্পিত পৃথিবী। সূর্যের সঙ্গে পৃথিবীর বিবাহ দেওয়াই এই অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য। চৈত্র মাস হইতে বর্ষার প্রারম্ভ পর্যন্ত সূর্য যখন প্রচণ্ড অগ্নিময় রূপ ধারণ করে তখন সূর্যের তেজ প্রশমন ও সুবৃষ্টির আশায় কৃষিজীবী সমাজ এই অনুষ্ঠানের উদ্ভাবন করিয়াছিল। গ্রাম্য শিব মন্দিরকে কেন্দ্র করিয়া এই উৎসবের অনুষ্ঠান হয়।”
৪. আবার অন্যমতে, নিজেদের কে যন্ত্রণা দিয়ে আমরা অনুভব করার চেষ্টা করি যে, এই পৃথিবীটা কুসুমাস্তীর্ণ নয়। সুখের সঙ্গে দুঃখকে গ্রহণ করতে পারলে জীবন সংগ্রামে জয়ী হওয়া যায়। তাই হয়তো শরীর কে যন্ত্রনা দিয়ে এই উৎসব পালন করার রেওয়াজ তৈরী হয়েছে।
৫. গাজন সূত্রপাতের দিনক্ষন বলা মুশকিল। বৌদ্ধধর্মের প্রভাব যখন কমে এসেছিল, তখন কিছু বৌদ্ধ সন্ন্যাসী হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। ফলে হিন্দু ধর্মের সাথে কিছু বৌদ্ধ তন্ত্র মন্ত্রের মিশ্রন হয়। এই তান্ত্রিক ক্রিয়া থেকেই সৃষ্টি হয় চড়ক পুজোর। সন্ন্যাসীরা তান্ত্রিক সাধনা অভ্যাসের ফলে নিজেদের শারীরিক কষ্টবোধের ঊর্ধ্বে উঠে যান। পিঠে বঁড়শি গাঁথা, দড়ি দিয়ে আগুনে উপর ঝুলিয়ে দেওয়া, জিভে বা শরীরের কোনও জায়গায় লোহার শিক গেঁথে দেওয়া বা ভাঙা কাচের টুকরোর ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া ইত্যাদি কষ্ট স্বীকার তারই অঙ্গ।
৬. গাজন সূত্রপাতের দিনক্ষন নিয়ে লোককথায় শোনা যায় নানা কাহিনি। শোনা যায়, বান রাজা শিবকে তুষ্ট করতে কৃচ্ছ্বসাধনের মধ্য দিয়ে তপস্যা করেছিলেন। শিবভক্তির সেই সূত্র ধরেই চড়কের সন্ন্যাসীরা আজও বান ফোঁড়ান, নানা ধরনের ঝাঁপ দেন। আগুনঝাঁপ, কাঁটাঝাঁপ, বঁটিঝাঁপ, ঝুলঝাঁপ ইত্যাদি তারই অঙ্গ। বাংলার কোনও কোনও অঞ্চলে গাজনে নরমুণ্ড নিয়ে নৃত্যের প্রচলন আছে।
৭. যদিও প্রথমে গাজন উৎসব নিম্নবর্গের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, পরবর্তীতে ১৪৮৫ সালে উচ্চ স্তরের লোকদের মধ্যে এ অনুষ্ঠানের প্রচলন শুরু করেন সুন্দরানন্দ ঠাকুর নামের এক রাজা। এ পূজার অপর নাম নীল পূজা। গম্ভীরাপূজা বা শিবের গাজন এই চড়কপূজারই রকমফের।
৮. ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার আইন করে গাজনের নামে ‘শারিরীক নির্যাতন’ প্রথা বন্ধ করলেও গ্রামের সাধারণ লোকের মধ্যে এখনো তা প্রচলিত আছে।
[পৌরানিক কাহিনী ভিত্তিক রচনা/ লেখক- রূপেশ সামন্ত/ ০৫.০৪.২০১৮]

Sunday, 24 February 2019

বেনী পুতুল নাচ- Beni Putul Dance


বেণী পুতুল নাচ
লেখক- রূপেশ সামন্ত

বেণী পুতুল নাচ। পূর্ব মেদিনী পুরের অনন্য লৌকিক শিল্প। হাত ও আঙ্গুলের অসাধারন কারকুরিতে পুতুলের সাহায্যে নৃত্য পদর্শিত হয়। এই নৃত্য মানুষের কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনে বিজ্ঞান মনস্কতা গড়ে তুলতে বা মানুষকে সমাজ সচেতন করে অদ্বিতীয়।

অবয়ব
বেনী পুতুল তৈরী হয় মূলত কাঠ ও বাঁশ দিয়ে। পুতুলটিকে সুন্দর ভাবে শাড়ি বা জামা পরিয়ে সাজানো হয়। এই পুতুলকে নারী, পুরুষ বিভিন্ন মনুষ্য রূপে আমাদের সামনে উপস্থাপিত করা হয়। তালের আঁটি, মাটি বা কাঠ দিয়ে মুখমণ্ডল তৈরী করা হয়। লেখক- রূপেশ সামন্ত

চর্চাস্থল
এই ধরনের বেনী পুতুল নৃত্যের চর্চা হয় মূলত পূর্ব মেদিনীপুরের মুগবেড়িয়ার রাধাপুর, বায়েনদা, পদ্মতামলি প্রভৃতি এলাকায়।

নৃত্যকলা
শিল্পীরা পুতুলকে হাত ও আঙ্গুলের কৌশলের মধ্য দিয়ে নাচান। পুতুলের পেছন দিকে পোষাকের অন্তরালে হাত ও আঙ্গুলের ক্রিয়াকলাপ করেন। আর তার মাধ্যমেই পুতুল গুলি নাচতে থাকে। নাচের সঙ্গে সঙ্গে অসাধারন সব গান গাওয়া হয়। প্রতিটি গান কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বা বিজ্ঞান চেতনা মূলক। এই নাচের মধ্য দিয়ে যেমন দর্শক মনোরঞ্জন হয় তেমনি সমাজ সংস্কারের উদ্দেশ্যও সাধিত হয়।
লেখক- রূপেশ সামন্ত

বাংলাদেশের ভারত বিরোধিতা: আবেগ না রাষ্ট্রবুদ্ধি?

বাংলাদেশের ভারত বিরোধিতা: আবেগ না রাষ্ট্রবুদ্ধি? ✍️ রূপেশ কুমার সামন্ত  বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে সাম্প্রতিক কালে ভা...