Saturday, 10 April 2021

এক অন্যরকম উৎসব- Mahaprabhu Shreechaitanya

এক অন্যরকম উৎসব ©রূপেশ সামন্ত চলছে মহোৎসব প্রস্তুতি। অনিন্দ্য সুন্দর দৃশ্য! পাঁশকুড়া ব্লকের চৈতন্যপুর১ অঞ্চলের কালই তেলিপুকুর মাঠে মহাপ্রভুর হরিনাম সংকীর্তন ও মহামেলা সপ্তাহব্যাপী চলছে। সেই উপলক্ষে আজ মহোৎসব। গতকাল সারাদিন ধরে চলেছে অন্নপ্রসাদ প্রস্তুতি পর্ব। করোনা পরিস্থিতিতে কিছুটা ভাটা পড়লেও প্রায় ২০-২৫ হাজার মানুষ প্রসাদ গ্রহন করবেন।
ডাল, বিচাকলার ছেঁচড়া, কুমড়োর ঘন্ট, পটলের তরকারি, চাটনি ইত্যাদি থাকছে জনপ্রিয় মেনু হিসাবে। পার্শ্ববর্তী ৪০-৫০টি গ্রামের মানুষ একযোগে হাতে হাত লাগিয়ে এই 'মহাযজ্ঞ' সম্পন্ন করেন। নিজেদের ক্ষেতের চাল, কুমড়ো, পটল, আলু, বিচাকলা, টমেটো ইত্যাদি মহাপ্রভুর উদ্দেশ্যে দান করেন। এছাড়া বহু ভক্ত তেল, মশলা, জ্বালানি, অর্থ ইত্যাদি দিয়ে মহোৎসবে সাহায্য করেন। বাড়ির মেয়েরা আগের দিন থেকে বাড়ির বঁটি নিয়ে এসে সবজি কাটাকুটিতে সাহায্য করেন। ভক্তরা সপ্তাহব্যাপী সারাদিন সারারাত এখানে থেকে হরিনাম শুনে মেলার আনন্দ উপভোগ করে সময় অতিবাহিত করেন। এখানকার মানুষেরা এই দিনটির জন্য সারাবছর অপেক্ষা করে থাকেন। আজ মহোৎসবে চলে আসুন, প্রত্যক্ষ করুন এক অন্যরকম উৎসব।

তেলিপুকুর মাঠে মহাপ্রভুর মহোৎসব- Mahaprabhu Shreechaitanya

তেলিপুকুর মাঠে মহাপ্রভুর মহোৎসব ✍️রূপেশ সামন্ত ভাত, ডাল, বিচাকলার ছেঁচড়া, কুমড়ার ঘন্ট, পটলের তরকারি, চাটনি ছিল মহাপ্রসাদ। আয়োজন ছিল ২৫ হাজার মানুষের। এই মহাযজ্ঞে প্রসাদ বিতরণ করেছিল নারী বাহিনী। সহযোগী ছিল পুরুষরা। সুশৃঙ্খল ভাবে হাজার হাজার মানুষ প্রসাদ গ্রহন করেছে। একই সঙ্গে চলছে মহানাম যজ্ঞ। হাজার হাজার ভক্তবৃন্দ ভক্তিভরে শুনছে নামগান। সপ্তাহব্যাপী 'মহা মহা মহানাম যজ্ঞে'র আজ ছিল শেষ দিন। মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবের ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত ৪০-৫০টি গ্রামের মানুষ পাঁশকুড়ার চৈতন্যপুর-১ অঞ্চলের কালই গ্রামের তেলিপুকুর মাঠে এই মহোৎসব ও মহানাম যজ্ঞ করে। এই অনুষ্ঠানে সর্বধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষ যোগদান করে সম্প্রীতির মহামিলন ক্ষেত্র গড়ে তুলে। সর্বোপরি নারী-পুরুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দিনরাত এক করে এই মহা অনুষ্ঠান যেভাবে সম্পন্ন করে, তা শিক্ষনীয়। আমাদের এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সত্যিই গর্বের। ©রূপেশ সামন্ত

Friday, 9 April 2021

গঙ্গামাড়ো তলার গঙ্গার বিগ্রহই হল গঙ্গার একমাত্র প্রাচীন দারুবিগ্রহ- Ganga

গঙ্গামাড়ো তলার গঙ্গার বিগ্রহই হল গঙ্গার একমাত্র প্রাচীন দারুবিগ্রহ ©রূপেশ সামন্ত
হাজারো মানুষের ভীড়ে ছাপিয়ে যায় পলাশপাই নদীর দু’কুল। পশ্চিম মেদিনীপুরের দাসপুর-২ ব্লকের গৌরার গঙ্গামাড়ো তলার গঙ্গাপূজা ও বারুনী স্নান নিয়ে জড়িয়ে আছে বহু লোককথা ও ইতিহাস। উৎসবের সময়টা হল চৈত্র মাসের মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী। এই সময় গঙ্গাপূজা উপলক্ষ্যে সপ্তাহ ব্যাপী চলে বিরাট মেলা। প্রায় ২৫০ বছরের প্রাচীন মেলায় আজও দূর-দুরান্তের বহু ধর্মপ্রাণ মানুষের সমাগমই প্রমান করে তার সূদুরপ্রসারী মাহাত্ম্য। মেলাটি গঙ্গা-বারুনি মেলা নামে পরিচিত। আসলে মেলার কেন্দ্রে রয়েছে প্রাচীন গঙ্গাদেবী ও তাঁর মাহাত্ম্য। এই দেবীকে নিয়ে প্রচলিত রয়েছে টান-টান উত্তেজনাপূর্ণ এক লোককথা। গৌরার এই গঙ্গা মন্দিরের স্থানটি গঙ্গামাড়ো তলা নামে পরিচিত। প্রায় ২৫০ বছর পূর্বে পলাশপাইয়ের তীরের এই স্থানটি ছিল শ্মশান। চারিদিকে ছিল ঘন জঙ্গল। একদিন এক শাঁখারী শাঁখা বিক্রি করছিল এই এলাকায়। একটি মেয়ে এসে শাঁখারীর কাছে একজোড়া শাঁখা কিনল। শাঁখারী শাঁখার মূল্য চাইলে মেয়েটি বলে, “আমার বাবার নাম রামকিশোর প্রামানিক। আমি এখন নদীতে স্নান করতে যাচ্ছি। বাবার কাছে শাঁখার মূল্য নিয়ে নেবে। টাকা বাড়ির কুলুঙ্গিতে রাখা আছে”। রামকিশোর প্রামানিক ছিলেন এই এলাকার একজন ধনী ব্যবসায়ী এবং নিঃসন্তান। শাঁখারী মেয়েটির কথামতো রামকিশোর বাবুর বাড়িতে উপস্থিত হলেন এবং শাঁখার মূল্য চাইলেন। তখন রামকিশোর বাবু ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন এবং বললেন, “আমার কোন কন্যাসন্তান নেই। আমার সঙ্গে প্রতারনা করতে এসেছো”? শাঁখারী হতাশ হলেন। এরপর কৌতুহলভরে রামকিশোর বাবু মেয়েটিকে দেখতে চাইলেন। শাঁখারী তাঁকে পলাশপাই নদীর তীরে নিয়ে গেলেন। কিন্তু কাউকে দেখতে পেলেন না। রামকিশোর বাবু শাঁখারীকে ভৎর্সনা করলেন। শাঁখারী ক্ষমা চাইলেন। এমন সময় নদীঘাট থেকে হঠাৎ এক নারীকণ্ঠ শুনতে পেলেন। নদীর দিকে তাকিয়ে দুজনেই বিস্ময়ে আবিষ্ট হয়ে গেলেন। অসীম জ্যোতিতে নদীর জল থেকে উপরে উঠে এসেছে এক নারীর দুটি দণ্ডায়মান হাত। সেই হাতে পরিধান করা রয়েছে শাঁখারীর সেই দুটি শাঁখা। নারীকণ্ঠে উচ্চারিত হল, ‘বাবা, আমি গঙ্গা। তোমার মেয়ে। আমিই শাঁখা কিনেছি। বাড়ির কুলুঙ্গিতে টাকা রাখা রয়েছে। শাঁখারীকে দিয়ে দিও’। তারপর নিমেষেই সব অদৃশ্য হয়ে গেল। রামকিশোর বাবু ছুটলেন বাড়িতে। দেখলেন কুলুঙ্গিতে সত্যিই শাঁখার মূল্য রয়েছে। রামকিশোর বাবু নিজে কখনোই এইভাবে কুলুঙ্গিতে টাকা রাখেন না। এই অলৌকিক কাণ্ডে তিনি বাহ্যত বিমূঢ় হয়ে গেলেন। পরে সেই মূল্য তিনি শাঁখারীকে দিয়ে দিলেন। ঘটনার আকস্মিকতায় রামকিশোর বাবু বিহ্বল হয়ে রইলেন। সেই রাতে স্বপ্নাদিষ্ট হলেন যে, গঙ্গা তাঁর কন্যরূপে এখানে অধিষ্ঠ হতে চান এবং ভোরের বেলা পলাশপাইয়ের জলে গঙ্গা ভেসে আসবেন। রামকিশোর বাবু ভোরবেলা ছুটলেন পলাশপাইয়ের তীরে। পলাশপাইয়ের জলে ভেসে এল এক নিমকাঠের দারুবিগ্রহ। সেই দারুবিগ্রহটি ছিল মকরের উপর দণ্ডায়মান গঙ্গার বিগ্রহ। রামকিশোর বাবু সেই বিগ্রহ পলাশপাইয়ের তীরে প্রতিষ্ঠা করলেন। পরে পঞ্চরত্ন মন্দির স্থাপন করলেন। গঙ্গার বিগ্রহ প্রতিষ্ঠার দিনটি ছিল মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী। সেই থেকে প্রতিবছর মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশীতে উদযাপিত হয় গঙ্গার প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী ও বারুনী স্নান পর্ব। এখানে বিবাহিত মহিলারা স্বামীর মঙ্গল কামনায় নতুন শাঁখা পরে পলাশপাইয়ের জলে ‘বারুনী স্নান’ করে। আর বসে বিরাট মেলা। চৈত্র মাসকে মধুমাস বলাহয়। তাই চৈত্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশীকে মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী বলা হয়। এই চৈত্র বা মধু মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশীতে শতভিষা নক্ষত্রের যোগ হলে, তাকে বারুণী তিথি বলে। শতভিষা নক্ষত্রের আরেক নাম বরুণ। শতভিষা নক্ষত্র তথা বরুণ নক্ষত্রের নামানুসারে এই যোগকে বারুণীযোগ বলা হয়। এই সময় গঙ্গাস্নানে বহুশত সূর্যগ্রহন জনিত গঙ্গাস্নানের সমান ফল লাভ হয়। বারুণী হল গঙ্গা স্নানের একটি বিশেষ যোগ। গঙ্গামাড়ো তলার পলাশপাই নদীটি পূন্যার্থীদের কাছে গঙ্গারই প্রতিরূপ। তাই মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী তথা বারুনী তিথিতে এখানে গঙ্গাপূজা উপলক্ষ্যে পূন্যার্থীরা মনস্কামনা পূরণে বারুনী স্নান করে। সেই উপলক্ষ্যে আয়োজিত হয় বিরাট মেলা। গঙ্গার প্রাচীন ‘পঞ্চরত্ন’ মন্দিরটি এখন আর নেই। কালের গর্ভে ধ্বংস হয়ে গেছে। সেই প্রাচীন মন্দিরের ফলকে লেখা ছিল, ‘সন ১১/৮৭ সাল/ বিস্তিথ ২১/ আঘ্রান’। সুতরাং ফলক অনুসারে প্রাচীন মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৭৮০ খ্রিষ্টাব্দে। বর্তমানে নতুন মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মন্দিরের সামনে রয়েছে রামকিশোর প্রামানিকের স্মৃতি ফলক। মন্দিরে প্রাচীন দারুবিগ্রহটিই রয়েছে। দারুবিগ্রহটি নিমকাঠের তৈরি। মন্দিরের পুরোহিত শক্তিশংকর চক্রবর্তীর মতে, এই বিগ্রহটি রামকিশোর প্রামানিক প্রতিষ্ঠিত সেই প্রাচীন দারুবিগ্রহ। তবে দারুবিগ্রহটি যে খুবই প্রাচীন, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। বহু বছর অন্তর বিগ্রহের ‘অঙ্গরাগ’ হয়। এই অঙ্গরাগের মধ্য দিয়ে বিগ্রহটিকে নবরূপে সজ্জিত করা হয়। যতদূর জানা যায়, গঙ্গার এইরূপ দারুবিগ্রহ পশ্চিমবঙ্গের আর কোথাও নেই। গঙ্গার অদ্বিতীয় দারুবিগ্রহের সাথে অনন্য মাহাত্ম্য গঙ্গামাড়ো তলার গঙ্গাকে করে তুলেছে পূন্যার্থীদের গন্তব্যের অন্যতম কেন্দ্র।

Wednesday, 31 March 2021

খেলা হবে- Khela Hobe- Game on

এ কি শুনছি! রাজনীতি নাকি ‘খেলা’, অর্থনীতি নাকি ‘হেলাফেলা’! ✍রূপেশ সামন্ত
একদল বলছে আমি ‘এক টাকায়’ সব দেবো। আরেক দল বলছে আমি ‘বিনা পরসায়’ সব দেবো। অন্যদল বলছে আমি ‘বিনা পয়সায়’ ‘দ্বিগুন’ দেবো। কোথা থেকে দেবে, কেনো দেবে, কার নিয়ে দেবে, ভবিষ্যৎ কি- এসব অর্থনীতির প্রশ্ন অবান্তর! সবই আসলে ‘খেলা’! আর এ ‘খেলা’ যে আত্মঘাতী খেলা- বুঝবে কবে আপামর বাঙালি! জনগন বলছে, ‘দিচ্ছে, ...তাই খাচ্ছি’। রাজনীতি বলছে, ‘দিচ্ছি, ...তাই (ভোট) পাচ্ছি’। আর জনগনের মধ্যে বাড়ির শিক্ষিত বেকার ছেলেটি বলছে, ‘কাজ নাই’। সেই জনগনের মধ্যে প্রান্তিক কৃষকটি বলছে, ‘ফসলের দাম নাই’। সেই জনগনের মধ্যে ব্যাগ হাতে করে রোজ বাজারে যাওয়া ক্রেতাটি বলছে, ‘সস্তায় কিছু নাই’। চারিদিকে শুধু ‘নাই’, ‘নাই’! পাইয়ে দেওয়া, দান-খয়রাতির রাজনীতিতে অর্থনীতির যে পুরো বারোটা বাজে, সেটা নিয়ে আসলে আমাদের কোন মাথা ব্যাথা ‘নাই’। অপ্রয়োজনীয় খয়রাতিতে যে মানব সম্পদের অপব্যবহার হয়, উৎপাদন হ্রাস পায়, ঋণ বাড়তে থাকে, মুদ্রাস্ফীতি হয়- সেই ভাবনা আমাদের কোথায়? ধীরে ধীরে আমরা ‘অচলায়তন’ অর্থনীতির আবর্তে একটি ‘স্থবির’ মানব সম্পদ যুক্ত সমাজ গড়ে তোলার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, অস্বাস্থ্য, গুনমানহীন জীবন-যাপনের ঘুর্ণিপাকে আরও ডুবছি আমরা। রাজনীতির সাথে অর্থনীতির গভীর যোগ। অথচ অদ্ভূতভাবে এই ভোটের ‘খেলা’র বাজারে রাজনৈতিক দল গুলির অর্থনীতির চর্চা সে ভাবে চোখে পড়েনি। কিভাবে বেকার ছেলে গুলো কাজ পাবে, কিভাবে মূল্যবৃদ্ধি হ্রাস হবে, কিভাবে ঋণের বোঝা কমবে, কিভাবে প্রকৃত গরীবকে সাহায্য করা হবে- সে চর্চা "খেলা হবে"র উত্তাপে হারিয়ে গেছে। হয়তো বা ‘পাব্লিক’ শুনতে চায়নি সেসব, "খেলা" দেখতে চেয়েছে! যাইহোক, আমাদের মতো কৃষিপ্রধান দেশে কৃষি-অর্থনীতির প্রভুত উন্নতির সুযোগ রয়েছে। সে বিষয়ে চর্চা হতে পারতো। কৃষি প্রযুক্তির উন্নতিকরণ, কৃষির জৈবিকীকরণ, কৃষি উৎপাদন, কৃষিজাত পন্যের প্রক্রিয়াকরণ, কৃষি বিপনন প্রভৃতি ক্ষেত্রে বিশাল উন্নতির সুযোগ রয়েছে। এতে কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে অর্থনীতির উন্নতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তো। এছাড়াও প্রাকৃতিক সম্পদ, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, শিল্প পরিকাঠামো, স্বাস্থ্য পরিকাঠামো, গ্রামীন পরিকাঠামো ইত্যাদি বিষয়ে কোন রাজনৈতিক দল সে ভাবে দিশা দেখালো না। শুধু ‘খেলা’, ‘খেলা’ আর ‘খেলা’! আমরা মেনে নিয়েছি, মেনে নিচ্ছি বা মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছি। এই হল গড়পড়তা বাঙালির মনন। আসলে রাজনৈতিক দল বা নেতাদের ভাবনার সঙ্গে আমরা সুন্দরভাবে ‘সেট’ করে নিচ্ছি। রাজনীতির সর্বগ্রাসী দুর্বৃত্তায়ন, সর্বব্যাপী দুর্নীতির আগ্রাসন ও সর্বনাশী ক্ষমতার আস্ফালন আমাদের ‘সেট’ হতে অনুঘটকের কাজ করছে। রাজনীতিটাকে ‘খেলনা’ করে কি সুন্দর ভাবে ‘খেলা’ খেলে অর্থনীতিটাকে ‘হেলাফেলা’ করে দেওয়া গেছে! দারুন "খেলা চলছে"! ✍️রূপেশ সামন্ত

পাঁশকুড়া পশ্চিম বিধানসভাঃ বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক স্থায়িত্ব থাকলেও বড় উন্নয়ন অধরা Panskura Paschim Assembly Constituency

পাঁশকুড়া পশ্চিম বিধানসভাঃ বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক স্থায়িত্ব থাকলেও বড় উন্নয়ন অধরা
পাঁশকুড়ার বৃহৎ উন্নয়ন কোথায়? স্বাধীনতার ৭৫ বছরের দোর গড়ায় এসে এই বৃহৎ প্রশ্নটি মনে জাগে। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে তা আরও প্রাসঙ্গিক। প্রশ্ন-১। এই জেলারই অন্য অংশে অনেক বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠিত হলেও পাঁশকুড়ায় বৃহৎ কোন শিল্প কোথায়? প্রশ্ন-২। পাঁশকুড়ার রেলপথের বয়স ১০০ বছরের বেশি। পাঁশকুড়ার লেভেল ক্রসিংয়ে আজও কেন ফ্লাইওভার হলো না? প্রশ্ন-৩। পাঁশকুড়ায় রয়েছে প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি-মন্দির-মসজিদ-পুরাকীর্তির স্বর্ণখনি। আজও কেন পাঁশকুড়া ‘ঐতিহ্যের পর্যটন কেন্দ্র’ হয়ে উঠলো না? প্রশ্ন-৪। প্রাচীন কাল থেকেই পাঁশকুড়া ফুল-সব্জী-কৃষির সমৃদ্ধ ক্ষেত্র। আর কতদিন লাগবে বিপনন-সংরক্ষণ-প্রক্রিয়াকরণ-পর্যটন শিল্পের পরিকাঠামো গড়তে? প্রশ্ন-৫। পাঁশকুড়ার শহর থেকে দক্ষিণাঞ্চল কয়েক মাস ধরে জলমগ্ন থাকে। এরজন্য বৃহৎ মাস্টারপ্ল্যান ও তার রূপায়ন আর কবে হবে? প্রশ্ন-৬। পাঁশকুড়ার উপর দিয়ে বয়ে গেছে কাঁসাই ও ক্ষীরাই নদী। ২/৩টি পাকার ফুট ব্রীজ ছাড়া সব গুলিই বাঁশের বা কাঠের। বড় যানবাহন চলাচলের যোগ্য পাকার ব্রীজ গুলি আর কবে হবে? প্রশ্ন-৭। পাঁশকুড়াবাসীকে আজও জরুরী ও জটিল স্বাস্থ্য পরিষেবার জন্য ছুটতে হয় তমলুক বা কলকাতায়। পাঁশকুড়ায় বৃহৎ স্বাস্থ্য পরিষেবা কবে আর গড়ে উঠবে ? প্রশ্ন-৮। পাঁশকুড়ায় প্রায় ৩০ হাজারের বেশি তপশিলী জাতি ও প্রায় ১৩ হাজারের বেশি তপশিলী উপজাতির মানুষ বসবাস করেন। এদের সংস্কৃতির সংরক্ষণ করতে এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান প্রভৃতি ক্ষেত্রে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে ও স্বনির্ভর করতে পাঁশকুড়া কেন্দ্রিক বৃহৎ পদক্ষেপ কবে আর হবে? প্রশ্ন-১০। পাঁশকুড়ার পথগুলি অত্যন্ত দুর্ঘটনা প্রবন। প্রতিবছর দুর্ঘটনায় বহু মানুষের অকাল মৃত্যু ঘটে। পথচারীদের নিরাপত্তা বিধানে আধুনিক আধুনিক ‘ট্রাফিক কন্ট্রোল’ পরিকাঠামো কবে আর গড়ে তোলা হবে? প্রশ্ন-১১। পাঁশকুড়ায় প্রায় সাড়ে তিনশোটি বিভিন্ন স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠান গুলির পরিকাঠামোগত উন্নয়নের ব্যাপক অসামাঞ্জস্য রয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলির সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়ন ও কর্মমুখী বৃত্তিমুলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কাজ কবে আর শুরু হবে?
এবার পাঁশকুড়া পশ্চিম বিধানসভা কেন্দ্রের রাজনৈতিক স্থায়িত্বের পরিসংখ্যান ও বিশ্লেষনে আসি। এই কেন্দ্রে এ পর্যন্ত ১৬টি বিধানসভা নির্বাচন হয়ে গেছে। ২০২১এর নির্বাচন আসন্ন। বিগত ১৬টি নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থী তথা বিধায়করা হলেন- ১। শ্যামাদাস ভট্টাচার্য- কংগ্রেস (১৯৫২) ২। শ্যামাদাস ভট্টাচার্য- কংগ্রেস (১৯৫৭) ৩। শ্যামাদাস ভট্টাচার্য- কংগ্রেস (১৯৬২) ৪। রজনীকান্ত প্রামানিক- বাংলা কংগ্রেস (১৯৬৭) ৫। অহীন্দ্র মিশ্র- বাংলা কংগ্রেস (১৯৬৯) ৬। ওমর আলি- সি.পি.আই (১৯৭১) ৭। ওমর আলি- সি.পি.আই (১৯৭২) ৮। ওমর আলি- সি.পি.আই (১৯৭৭) ৯। ওমর আলি- সি.পি.আই (১৯৮২) ১০। ওমর আলি- সি.পি.আই (১৯৮৭) ১১। ওমর আলি- সি.পি.আই (১৯৯১) ১২। চিত্তরঞ্জন দাসঠাকুর- সি.পি.আই (১৯৯৬) ১৩। চিত্তরঞ্জন দাসঠাকুর- সি.পি.আই (২০০১) ১৪। চিত্তরঞ্জন দাসঠাকুর- সি.পি.আই (২০০৬) ১৫। ওমর আলি- তৃণমুল কংগ্রেস (২০১১) ১৬। ফিরোজা বিবি- তৃণমুল কংগ্রেস (২০১৬) উপরের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিগত ১৬টি বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রে সি.পি.আই জয়লাভ করেছে ৯ বার, কংগ্রেস জয়লাভ করেছে ৩ বার, বাংলা কংগ্রেস জয়লাভ করেছে ২ বার এবং তৃণমুল কংগ্রেস জয়লাভ করেছে ২ বার। এছাড়াও এই কেন্দ্র থেকে বিধায়ক হয়ে মন্ত্রী হয়েছেন ২ জন যথাক্রমে শ্যামাদাস ভট্টাচার্য ও ওমর আলি। আবার পাঁশকুড়া পশ্চিম বিধানসভা কেন্দ্রটি ১৯৫২-১৯৭১ সালের মধ্যে অনুষ্ঠিত ৫টি লোকসভা নির্বাচনে ‘ঘাটাল লোকসভা কেন্দ্রে’র অন্তর্গত ছিল। ১৯৭৭-২০০৪ সালের মধ্যে অনুষ্ঠিত ১০টি লোকসভা নির্বাচনে পাঁশকুড়া পশ্চিম বিধানসভা কেন্দ্রটি ‘পাঁশকুড়া লোকসভা কেন্দ্রে’র অন্তর্গত ছিল। ২০০৯ সাল থেকে অদ্যাবধি অনুষ্ঠিত ৩টি লোকসভা নির্বাচনে পাঁশকুড়া পশ্চিম বিধানসভা কেন্দ্রটি ‘ঘাটাল লোকসভা কেন্দ্রে’র অন্তর্গত ছিল। সুতরাং বিগত মোট ১৮টি লোকসভা নির্বাচনে (উপ নির্বাচন সহ) দলগত বিজয়ী দল গুলো হল- কংগ্রেস ৩ বার, সি.পি.আই ১০ বার, জনতা ১ বার, সি.পি.এম ১ বার, উপনির্বাচন সহ তৃণমুল ৩ বার। এই কেন্দ্রেরই এম.পি. শচীন্দ্রনাথ চৌধুরী, পরিমল ঘোষ ও আভা মাইতি কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও হয়েছেন। এতো তথ্য-পরিসংখ্যান দেওয়ার উদ্দেশ্য একটাই যে, এখানে এক একটি রাজনৈতিক দল দীর্ঘদিন দাপটের সঙ্গে স্থায়ী থেকেছে এবং কেন্দ্র-রাজ্যে মন্ত্রীত্বও করেছে। দাপুটে বিধায়ক-সাংসদরাও এই কেন্দ্রেরই ফসল। অথচ পাঁশকুড়ার বৃহৎ উন্নয়ন অধরা থেকে গেল কেন? রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব? অর্থনৈতিক অভাব? নাকি চিন্তার দৈনতা? ©রূপেশ সামন্ত (পুনশ্চঃ মতামত সম্পূর্ণ রূপে ব্যক্তিগত। আর্টিকেলটি রাজনৈতিক হলে কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রনোদিত ভাবে লেখা নয়। এই লেখা কাউকে বা কোন দলকে আঘাত করে থাকলে আমি আগাম ক্ষমাপ্রার্থী। আপনারাও তথ্য দিয়ে ও শালীনতা বজায় রেখে মতামত ব্যক্ত করতে পারেন।)

Monday, 29 March 2021

মাটির 'সোরা'। কুমোর শিল্প।

মাটির 'সোরা'। কুমোর শিল্প। এই গ্রীষ্মে এগুলির চাহিদা প্রচুর। বিষেষত এই সময় মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের অনুগামী ও বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীরা হরিনাম সংকীর্তন বা নিশিকীর্তনের পর নানাস্থানে মহোৎসবের আয়োজন করে। এই ধরনের মহোৎসবে পোড়ামাটির 'সোরা' প্রসাদ বিতরণে ব্যবহৃত হয়। তাই এই সময় মাটির 'সোরা' তৈরিতে কুম্ভকার পাড়ায় ব্যস্ততা তুঙ্গে থাকে। মাটির 'সোরা' গুলিকে রোদে শুকিয়ে খড়ের আগুনে ভাটিতে পোড়ানো হয়। এরপর পোড়ামাটির 'সোরা' গুলি চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। ছবিতে 'সোরা' গুলি পাঁশকুড়া ব্লকের চৈতন্যপুর-২ অঞ্চলের কিসমত জগন্নাথ চক গ্রামের কুম্ভকার পাড়ার। এই শিল্প এখন অবলুপ্তপ্রায়। শিল্পজাত দ্রব্যগুলি অলাভজনক হওয়ায় শিল্পীরা উৎসাহ হারাচ্ছে। তারা অন্য পেশায় আগ্রহী হয়ে উঠছে। প্রয়োজন উন্নত শিল্প-পরিকাঠামো গড়ে তোলা ও লাভজনক বিপনন ব্যবস্থা তৈরি করা। ✍️রূপেশ সামন্ত

Sunday, 21 February 2021

বঞ্চিত ‘বারাং চিতি’

ভাষা দিবসে আওয়াজ উঠুক- বঞ্চিত ‘বারাং চিতি’র স্বীকৃতি চাই ©রূপেশ সামন্ত
বিপুল হাত তালির মধ্য দিয়ে শেষ হল মৌ মনগাণ্ডির কবিতা পাঠ। সেটা ছিল পাড়ার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আসর। সু্কুমার গাগরাই বিপুল হাত তালির মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক ভাষায় গল্প বলে প্রথম পুরস্কার পেল। সে গল্পটি বলেছিল স্কুলের গল্প-কথা কম্পিটিশনে। মৌ পড়ে ক্লাস ফাইভে। আর সুকুমার ক্লাস সেভেনে পড়ে। দুজনেই কবিতা আর গল্প পাঠ করেছে বারাংচিতি ভাষায়। বেশির ভাগ সাধারণ মানুষ এই ভাষার অর্থ না বুঝলেও এই ভাষার আকর্ষণ তাদের কাছে এতটুকুও কম নেই। তপশিলি উপজাতি গোষ্ঠী ভূক্ত হো সম্প্রদায়ের মানুষের নিজস্ব ভাষা হল বারাং চিতি (Warang Chiti)। উপরোক্ত খণ্ডচিত্র গুলি পূর্ব মেদিনীপুর জেলার পাঁশকুড়া ব্লকের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের। কেবল পাঁশকুড়া ব্লকেই এখনও প্রায় দু’হাজার মানুষ বারাং চিতি ভাষায় কথা বলে। তাহলে গোটা ভারতবর্ষের চিত্রটি কত বিশাল, তা সহজেই অনুমেয়। বারাং চিতি হল হো সম্প্রদায়ের মানুষের ভাষার লিখিত রূপ। এটির আবিস্কর্তা লাকো বডরা। তিনি ঝাড়খণ্ডের পশ্চিম সিংভূমের বাসিন্দা। জন্ম ১৯১৯ সালের ১৯শে সেপ্টেম্বর। হো সম্প্রদায়ের হো ভাষাটি অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষা গোষ্ঠীর মুণ্ডা ভাষা। এই ভাষায় হো, মুণ্ডা, কোল প্রভৃতি সম্প্রদায়ের মানুষ কথা বলে। প্তিটি ভাষার মধ্যে তার জাতিসত্ত্বা লুকিয়ে থাকে। লুকিয়ে থাকে সেই জাতির স্বাভিমান। প্রতিটি সম্প্রদায়ের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। সেই ঐতিহ্যের সঠিক গুনগত বহিঃপ্রকাশ একমাত্র সেই সম্প্রদায়ের মাতৃভাষার মধ্য দিয়েই সম্ভব বলে বিশ্বাস করি। কিন্তু সেই ভাষার সরকারি স্বীকৃতি না থাকলে কি হবে? হো সম্প্রদায়ের মানুষের নিজস্ব সংস্কৃতি, নিজস্ব ঐতিহ্যের টুকরো টুকরো কিছু প্রকাশিত হয় দেবনাগরী, ওড়িয়া, বাংলা প্রভৃতি ভাষার মধ্য দিয়ে। হো সম্প্রদায়ের মধ্যে রয়েছে বিপুল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ভাণ্ডার। বারাং চিতিতে স্বীকৃতি নেই। ফলে বিপুল হো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বাদ থেকে বঞ্চিত আমরা সকলে। হারিয়ে যাচ্ছে তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, হারিয়ে যাচ্ছে তাদের জাতিসত্ত্বা। ইউনিভার্সিটি গ্রান্ট কমিশন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর জন্য এই ভাষার স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু ভারতের সংবিধানের ৮ম তপশিলে এই ভাষার স্বীকৃতি আজও মেলেনি। ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশা সরকারের কিছু প্রচেষ্টা এই বিষয়ে রয়েছে। হো সম্প্রদায়ের মানুষ লাগাতার ভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে বারাং চিতির স্বীকৃতি দাবী করছে। পরিশেষে আজও বঞ্চিত বারাং চিতি। তাই এই ভাষা দিবসে আওয়াজ উঠুক- বঞ্চিত ‘বারাং চিতি’র স্বীকৃতি চাই।

বাংলাদেশের ভারত বিরোধিতা: আবেগ না রাষ্ট্রবুদ্ধি?

বাংলাদেশের ভারত বিরোধিতা: আবেগ না রাষ্ট্রবুদ্ধি? ✍️ রূপেশ কুমার সামন্ত  বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে সাম্প্রতিক কালে ভা...