Monday, 1 April 2019

ছোট গল্প- শ্লেট


শ্লেট

[প্রকাশিত- নীল আকাশের খাতা]

 লেখক- রূপেশ কুমার সামন্ত


          'চা এর এই গরম জলই আজ গায়ে ঢালব! একবার ঘুম থেকে উঠুক! ছেলেটা কি আমার একার নাকি! আজ আমি আর গার্ডিয়ান মিটিংয়ে যাচ্ছি না!' স্বগতোক্তি করতে করতে রাগে টগবগ করে ফুটছিল দিদিমনি। সকাল বেলায় গ্যাস ওভেনে চা'য়ের জন্য জলটাও ফুটছিল টগবগ করে। দিদিমনির নাম মেঘা রায়। স্বামীও শিক্ষক। নাম সুতনু রায়। শিক্ষক দম্পতি শহরের একটি ফ্ল্যাটে থাকেন। তাদের একটি ছয় বছরের ছেলেও রয়েছে। সে বিগত দু'বছর ধরে স্কুলে যাচ্ছে। সে একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ক্লাস ওয়ানে পড়ে। গতকাল রেজাল্ট আউট হয়েছে। আজ অভিভাবক সাক্ষাতে ছাত্রদের খাতা দেখানো হবে।
         রান্নাঘরের পাশের রুমে তখনও শুয়ে আছে সুতনু। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবলেন, আজ আর চা খাওয়া হল না!
         চুপি চুপি উঠলেন সুতনু বাবু। মনে মনে ভাবলেন, গৃহশান্তি আগে! প্রাপ্য ছুটির বলিদান দেওয়াই ভালো! লুকিয়ে ফোন করলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষককে। ছুটিটা অনেক কষ্টে ম্যানেজ করলেন।
          সুতনু বাবু স্ত্রীকে ধীরে ধীরে বললেন, ‘মেঘা, আজ আমি অম্বরের স্কুলের গার্ডিয়ান মিটিংয়ে যাবো’। দিদিমনি তো আকাশ থেকে পড়লেন। ব্যাপারটা গোলমেলে ঠেকলো। রাগ এতো সহজে কমার নয়! রণমূর্তি ধারণ করে বলল, ‘আমি কি একাই ওর পড়ানোর জমিদারি নিয়ে রেখেছি। বাবার তো কোন দায় দায়িত্ব নেই! পাশের ফ্ল্যাটের ইশিতাদির মেয়ে রিকা এবারেও ফার্স্ট হয়েছে। তার বাবা-মা দু’জনে মিলে পড়ায়। তাহলে আমার ছেলের রোল দশ হবে না তো কি এক হবে!’
          এতক্ষণে সুতনু বুঝতে পারল দিদিমনির রাগের কারনটা। সংসারের শান্তি রক্ষায় সুতনু চুপ থাকাই শ্রেয় মনে করল। রেডি হয়ে সুতনু ছেলেকে নিয়ে স্কুলের দিকে রওয়ানা হল।
          স্কুলের একটি হল ঘরের মধ্যে সভা শুরু হল। সেখানে ছাত্র-ছাত্রী, অভিভাবক-অভিভাবিকা ও শিক্ষক-শিক্ষিকারা উপস্থিত। প্রধান শিক্ষিকার দীর্ঘ উপদেশ বানী কিছুক্ষণ চলল।
          এরপর ডাক পড়ল রিকা রায়ের। সঙ্গে মা ইশিতা রায়। প্রধান শিক্ষিকা বললেন, ‘আপনার মেয়ে ক্লাসে ফার্স্ট হলেও রেজাল্ট ভালো হয়নি। অন্য সাবজেক্ট গুলোতে ফুল মার্কস পেলেও ইংলিশে পঁচিশের চব্বিশ পেয়েছে। এক কম পেয়েছে। ওকে একটু চাপ দিন। প্র্যাকটিসটা বেশি করে করান। এতো কম পড়াশোনা করলে হবে না’।
          ইশিতা দেবী রিকার পিঠে ঠাস ঠাস করে মারতে লাগলেন। ‘কেন এক নম্বর কম পেলি বল। তোর আজ খাওয়াই বন্ধ’। ইশিতা দেবী রাগত ভাবে বলে চললেন।
          সুতনু চুপ থাকতে পারলেন না। ইশিতা দেবীকে থামিয়ে বললেন, ‘ওকে এভাবে মারবেন না। ও তো শিশু! পরীক্ষাটাই কি জিনিস ও তো বোঝে না! তাছাড়া এখানে ওর বন্ধুরাও রয়েছে। দেখুন, বেচারীর কেমন লজ্জায় ভয়ে মুখটা লাল হয়ে গেছে!’
          ইশিতা দেবী এবার খানিকটা উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। তিনি বললেন, 'দেখুন সুতনু বাবু, এই সময়টাই ওকে মানুষ করার বয়স। খেলাধুলার জন্য সারা জীবন পড়ে আছে'। বৃথা বাক্যব্যয় ভেবে সুতনু বাবু চুপ করে গেলেন।
          এরপর ইশিতা দেবী ব্যাগ থেকে একটা শ্লেট বের করলেন। সেটি প্রধান শিক্ষিকাকে দেখিয়ে বললেন, 'বাড়িতে ওকে এতো প্র‍্যাক্টিস করাই যে, খাতার যোগান দিতে হিমশিম খাচ্ছিলাম। তাই শেষে একটা শ্লেট কিনলাম। দেখুন, ওকে এত প্র‍্যাক্টিস করিয়েছি যে শ্লেটটা কেমন অস্পষ্ট হয়ে গেছে! আর কি করলে হবে বলুন তো?'
          প্রধান শিক্ষিকা বললেন, 'বা! দারুন আইডিয়া! ওকে শ্লেটেই আরো বেশি করে প্র‍্যাক্টিস করান'।
          এরপর আরো কিছু অভিভাকের সঙ্গে কথা বলার পর এলো সুতনু বাবুর পালা। প্রধান শিক্ষিকা বললেন, 'আপনার ছেলের তো পজিশন দশ হয়েছে। ওর প্রতিটা বিষয়ে তিন চার নম্বর করে কম আছে। বাড়িতে বেশি করে প্র‍্যাক্টিস করান। পড়াশোনায় একটু চাপ দিন'।
          সুতনু বাবু বিনীতভাবে বললেন, 'ম্যাম, কি চাপ দিই বলুন তো! ঐটুকু ছেলের ঐ ছোট্ট দেহটা কি চাপ সইতে পারবে? ওর মনটাও তো এখনও ততটা বড় হয় নি, যে এতটা চাপ নিতে পারবে!'
          প্রধান শিক্ষিকা বলে উঠলেন, 'ছেলেকে মানুষ করতে চাইলে পড়াশোনার চাপ তো দিতেই হবে'।
           'হুম, মানুষ করতেই তো চাই। কিন্তু চাপ নেওয়ার মতো শরীর আর মনটা তৈরি হোক। সারা জীবন তো ওকে চাপ বইতে হবে! ওকেই ওর লড়াই লড়তে হবে! এখন ওর শৈশবটা একটু উপভোগ করুক না! মন আর শরীরের বিকাশ হয়ে গেলে দেখবেন দু'বছরের পড়া দু'মাসেই শিখে ফেলেছে। ওর শ্লেটটা এখন খালিই থাক! পরে প্র‍্যাক্টিসের জন্য জায়গা তো রাখতে হবে!' গড়গড়িয়ে বলে গেলেন সুতনু বাবু।
          বেগতিক বুঝে প্রধান শিক্ষিকা আর কথা বাড়ালেন না। দ্রুত সভা শেষ করে দিলেন।
          সুতনু বাবু বাড়ি ফিরতে ফিরতে ছেলে অম্বরকে বলল, 'কিরে পরীক্ষায় তো ভালই রেজাল্ট করলি। যাবি নাকি রেষ্টুরেন্টে?'
          'কিন্তু মা তো রেগে আছে। রিকা ফার্স্ট হয়েছে। আমি হতে পারিনি। মাকে আমার ভয় লাগে। আমার পড়তেই ইচ্ছে করছে না আর!' অম্বর তার বাবাকে বলল।
           'দুর বোকা ছেলে! মাকে জড়িয়ে ধরে একটা হামি খেয়ে নিবি। দেখবি মায়ের সব রাগ চলে যাবে! আর রিকা ফার্স্ট হয়েছে তো কি হয়েছে! তুই কারো সাথে তুলনা করিস না! তুই তোর মতো করে খুব ভালো রেজাল্ট করেছিস'। সুতনু ছেলেকে বলল।
           'তুমি আমার খুব খুব ভালো বাবা! আমি তো ভালো রেজাল্ট করেছি! তাহলে আমায় একটা গিফট দেবে?' অম্বর বলল।
          'কি বল?' সুতনু বলল।
          'আমায় আজ মাঠে খেলতে নিয়ে যাবে? আমার রিকার সঙ্গে খেলতে খুব ইচ্ছে করে। রিকাও খেলতে চায়। ওর মা ওকে খেলতে দেয় না'।
          চোখটা ছলছল করে উঠল সুতনুর। সে বলল, 'হ্যাঁ, তুই রোজ খেলতে যাবি। খেলবি বেশি করে, আর ইচ্ছে হলে পড়বি'। তারা রেস্টুরেন্টে গেল। খাবারের চারটি পার্সেল নিল। অম্বর বলল, 'বাবা, আমরা তো তিনজন! চারটে পার্সেল কি হবে?''
         সুতনু বলল, 'তোর বন্ধু রিকাকে তার মা আজ খেতে দেবে না বলেছে। ওকে একটা পার্সেল লুকিয়ে দিয়ে আসবি'। অম্বর খুব খুশি হল। নাচতে নাচতে বাড়ি ফিরল।
        পরের বছর ক্লাস টু’য়ের রেজাল্ট বের হল। রিকা ক্লাসে থার্ড হল। আর অম্বরের পজিশন এইট। অভিভাবক সভায় সুতনু বাবু উপস্থিত হল। সভায় রিকার মা যথারীতি রিকার পিঠে বেশ কয়েক ঘা দিল। শাস্তিও ঘোষণা করল। রিকার দু'দিন খাওয়া বন্ধ। সেই সঙ্গে শ্লেটটাও দেখাতে ভূললেন না! পার্থক্যটা চোখে দেখা গেল। লিখতে লিখতে শ্লেটটা আগের চেয়ে অনেক অস্পষ্ট হয়ে গেছে।
          বাড়ি ফেরার পথে সুতনু বাবু ছেলেকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে ঢুকল। এবারে পাঁচটা পার্সেল নিল। অম্বরের কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই সুতনু বললেন, ‘তিনটে পার্সেল আমাদের জন্য। রিকার দুদিন খাওয়া বন্ধ। ওকে দুটো পার্সেল লুকিয়ে দিস। একটা ড্রাই ফুড আছে’। এবার অম্বর বলল, ‘আর আমার গিফট?’
          সুতনু বলল, ‘আজকে তোর সঙ্গে ডাবল টাইম খেলব। এটাই তোর গিফট’।
         ‘আই লাভ ইউ বাবা!’ বলেই অম্বর বাবার গলাটা জড়িয়ে ধরল। সুতনু বাবুর চোখের জল এসে গেল।
         কিন্তু মেঘা দিদিমনি ছেলেকে নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন। ছেলের প্রতি বাবার ‘উদাসীনতা’ তাকে যেন আরও রুষ্ট করে তুলেছে। সংসারের শান্তি রক্ষায় সুতনু বাবু বড্ড চুপচাপ হয়ে গেছেন। শুধু অদৃশ্য ভাবে রক্ষা করে চলেন ছেলে অম্বরকে।
        এই ভাবেই দু’বছর কেটে গেল। ক্লাস ফোরের রেজাল্ট আউট হয়েছে। এবার রিকা ক্লাসে টেন পজিশন পেয়েছে। আর অম্বর ক্লাসে ফার্স্ট। অভিভাবক সভায় সবাই হাজির। প্রধান শিক্ষিকার দীর্ঘ ভাষণ দিয়ে শুরু হল সভা।
        সভার শুরুতেই ইশিতা দেবী উদভ্রান্তের মতো ব্যাগ থেকে শ্লেটটা বেরঙ্করতে করতে বললেন, ‘কেন এমন হল বলতে পারেন? যে মেয়েটা ফার্স্ট হত, সে আজ পিছতে পিছতে দশ! এরপর তো ফেল করবে! এই দেখুন শ্লেটটা। এতো প্র্যাক্টিস করিয়েছি যে, শ্লেটটা আর স্পষ্ট দেখাও যায় না।  কালো শ্লেট সাদা হয়ে গেছে! আর কত প্র্যাক্টিস করাবো?’
         সুতনু বাবু নিস্পাপ মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ছিল। মানুষ হতে গিয়ে রিকার অবস্থাটা দেখে চোখটা ছলছল করে উঠল সুতনুর। এরপর তিনি দাঁড়িয়ে উঠে শুধু বললেন, ‘শ্লেটটা তো শৈশবেই ভরিয়ে ফেলেছেন। একটুও খালি রাখেন নি! প্র্যাক্টিস করবে কোথায়?’

০৫.০৮.১৮

Sunday, 24 February 2019

বেনী পুতুল নাচ- Beni Putul Dance


বেণী পুতুল নাচ
লেখক- রূপেশ সামন্ত

বেণী পুতুল নাচ। পূর্ব মেদিনী পুরের অনন্য লৌকিক শিল্প। হাত ও আঙ্গুলের অসাধারন কারকুরিতে পুতুলের সাহায্যে নৃত্য পদর্শিত হয়। এই নৃত্য মানুষের কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনে বিজ্ঞান মনস্কতা গড়ে তুলতে বা মানুষকে সমাজ সচেতন করে অদ্বিতীয়।

অবয়ব
বেনী পুতুল তৈরী হয় মূলত কাঠ ও বাঁশ দিয়ে। পুতুলটিকে সুন্দর ভাবে শাড়ি বা জামা পরিয়ে সাজানো হয়। এই পুতুলকে নারী, পুরুষ বিভিন্ন মনুষ্য রূপে আমাদের সামনে উপস্থাপিত করা হয়। তালের আঁটি, মাটি বা কাঠ দিয়ে মুখমণ্ডল তৈরী করা হয়। লেখক- রূপেশ সামন্ত

চর্চাস্থল
এই ধরনের বেনী পুতুল নৃত্যের চর্চা হয় মূলত পূর্ব মেদিনীপুরের মুগবেড়িয়ার রাধাপুর, বায়েনদা, পদ্মতামলি প্রভৃতি এলাকায়।

নৃত্যকলা
শিল্পীরা পুতুলকে হাত ও আঙ্গুলের কৌশলের মধ্য দিয়ে নাচান। পুতুলের পেছন দিকে পোষাকের অন্তরালে হাত ও আঙ্গুলের ক্রিয়াকলাপ করেন। আর তার মাধ্যমেই পুতুল গুলি নাচতে থাকে। নাচের সঙ্গে সঙ্গে অসাধারন সব গান গাওয়া হয়। প্রতিটি গান কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বা বিজ্ঞান চেতনা মূলক। এই নাচের মধ্য দিয়ে যেমন দর্শক মনোরঞ্জন হয় তেমনি সমাজ সংস্কারের উদ্দেশ্যও সাধিত হয়।
লেখক- রূপেশ সামন্ত

Saturday, 12 January 2019

Madhuboni Paintings

অন্য চোখে পুরি (৩)……
………মধুবনী দেওয়াল
© রূপেশ সামন্ত
রাম-সীতার বনবাস, নীলাচলে মহাপ্রভু বা কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ছবিতে ছবিতে ভরে উঠেছে দেওয়াল গুলো। এক দু'টো দেওয়াল নয়, একের পর এক দেওয়াল রঙীন চিত্রকলায় ভরে উঠেছে। শুধু সমূদ্রের ঢেউ নয়, মন ভরাবে পুরির দেওয়াল গুলোও। পুরির শুধু সরকারী দেওয়াল নয়, সাধারণ মানুষের প্রাচীরের দেওয়াল গুলো ভরে উঠেছে মধুবনী চিত্রকলায়।
পৌরানিক কাহিনী ও লোকগাথার দেওয়াল চিত্রকে মধুবনী চিত্র কলা বলে। মধুবনী চিত্রকলার জন্মস্থান নেপাল। সাধারণ মানুষ পৌরাণিক কাহিনি ও লোকগাথা দেওয়ালে এঁকে বোঝাতেন।ছবিতে রাম-সীতার বিবাহ, সীতার পাতাল প্রবেশ, রামায়ণের অন্যান্য কাহিনি, ছট পূজা ও স্থানীয় নাচের নক্সাও দেখতে পাওয়া যায়। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বিচরণের পূন্য ভূমি ছিল পুরি। সেকারণেই মধুবনী চিত্রকলায় শ্রীচৈতন্যের প্রভাব বেশি।
মধুবনী চিত্রকলা মৌলিক শিল্প।কোন স্থানে এই চিত্রকলায় ভৌগলিক, ঐতিহাসিক ও কিংবদন্তির দৃশ্যপটের উপস্থিতি বেশ লক্ষ্যনীয়। এই চিত্রকলায় রংয়ের ব্যবহার বেশ চিত্তাকর্ষক । দেখলে মন ভরে যায় সকলের। পুরির জগন্নাথ দর্শন ও সমূদ্রের ঢেউয়ের রেশ নিয়ে ভারাক্রান্ত মনে বাড়ি ফেরার পথে প্রাচীরের দেওয়াল গুলোর মধুবনী চিত্রকলা মনে আনন্দের জোয়ার আবার এনে দেবেই।
---- --- ---



Monday, 17 December 2018

Flutes of Puri- পুরির বাঁশি

অন্য চোখে পুরি------
---------------পুরির বাঁশি
লেখক- রূপেশ কুমার সামন্ত

     রাত তখন দশ’টা। ঢেউ গুলো আছড়ে পড়ছিল পায়ের কাছে। ঢেউয়ের সুরে সুর বাঁধছিল নস্ট্যালজিয়া। হঠাৎ এলোমেলো করে দিল হ্যামলিনের বাঁশি। সী-বিচের থিকথিকে ভীড়টা তখন আর নেই। চাঁদের প্রতিবিম্বের আলো-ছায়ায় স্পষ্ট দেখা যচ্ছিল বাঁশিওয়ালাকে। বাঁশির সেই সুরকে পিছু ধাওয়া না করে উপায় কি- ‘তোমার সুরে সুর বেধেছি…’!
     -‘তোমার বাঁশির সুরখানা বেশ! একটা ভিডিও করব?’ বলেই ফেললাম।
     -‘না, ভিডিও অডিও কোনটাই হবে না’। সটান বলে দিল বাঁশিওয়ালা।
     অগত্যা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে কানে শুনেই মন ভরানো ছাড়া উপায় রইলো না।
     পরদিন সন্ধ্যায় আবার ধাওয়া। কোথাও দেখা মিলল না সেই বাঁশিওয়ালার। মিলল এক অন্য বাঁশিওয়ালার। তাঁকেও আবদারটা করেই ফেললাম, ‘একটা ভিডিও করব?’
     -‘না, ভিডিও অডিও কোনটাই হবে না। এটাই আমাদের রীতি’।
     কারণ জিজ্ঞাসা করার ফুরসত ছিল না। ব্যবসায়িক তাগিদে সেই বাঁশিওয়ালা ততক্ষণে স্থান ত্যাগ করেছে। [লেখক- রূপেশ কুমার সামন্ত]
     এবার পা বাড়ালাম জগন্নাথ মন্দিরের দিকে। সেখানেই দেখা মিলল সেই প্রথম বাঁশিওয়ালার সাথে।
     -‘ভাই তোমার নাম কি?’ বন্ধুত্ব লাভের বাসনায় জিজ্ঞাসই করলাম।
     -‘বিকাশ রাজ’, উত্তর দিল বাঁশিওয়ালা।
     ব্যাস! কথায় কথায় জমে উঠল বন্ধুত্ব। বিকাশের আদি বাড়ি ছিল বিহার। কিন্তু সে কোনদিনই যায়নি সেখানে বা জানেও না বিহার কোন দিকে! তার কোন এক পূর্বপুরুষ পূন্য লাভের আশায় এসেছিল জগন্নাথ ধামে। আর ফেরা হয়নি। ঠাঁই নিয়েছে এই পূন্য ভূমিতে। সেই আদি পুরুষ থেকেই তারা রুটি-রুজির ভরসা করেছে শ্রীকৃষ্ণের মাহাত্ম্য মাখা পুরির শ্রীকৃষ্ণের বাঁশিকেই। সংস্কার বশতই তারা তাদের শিল্পী-স্বত্বাকে ক্যামেরা বন্দী করতে দেয় না।
     -‘তুমি পড়াশোনা কর?’ এবার জিজ্ঞাসা করলাম।
     -‘হ্যাঁ, স্কুলে যাই। বাবা অসুস্থ। বেরোতে পারে না। আমি বিকেল থেকে বাঁশি বিক্রী করি। লাভের ষাট-সত্তর টাকা বাবার হাতে তুলে দিই। নিজের কাছে কুড়ি টাকা রাখি। সেই টাকাতেই পড়াশোনা করি। পড়ার চাপ থাকলে বেরোতে পারি না’। বিকাশ একটানে কথা গুলো বলে গেল।
     পরিশেষে, নিজে থেকেই রাজী হয়ে গেল ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে।
     পুরি থেকে ফেরার দিন সন্ধ্যায় সী-বিচে ক্ষণিকের দেখা। জিজ্ঞাসা করলাম, ‘বিকাশ, কেমন আছো?’
     -বিকাশ উদাস ভাবে তাকিয়ে বলল, ‘ভালো অছি!’
লেখক- রূপেশ কুমার সামন্ত/ ২৬.১০.১৮ [Copyright Reserved by the Author]

Tuesday, 6 November 2018

Kali- Dewali

----------মহাদেবী কালী বিস্ময়ে কাটে জিভ---------
লেখক- রূপেশ কুমার সামন্ত
[আমার ‘নীল আকাশের খাতা’ বইটির কালী সম্পর্কিত একটি প্রবন্ধ আপনাদের সাথে শেয়ার করার মধ্য দিয়েই দিপাবলীর শুভেচ্ছা জানালাম।]
দশমহাবিদ্যার দশজন প্রধান তান্ত্রিক দেবীর প্রথম দেবী হল কালী। বিভিন্ন কালীর মধ্যে বিশেষ জনপ্রিয় হল শ্যামা কালীর পূজা।
হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, কালীই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির আদি কারণ। এই কালীই মাতৃরূপে পূজিত হন।
-----কালীর রূপভেদ----
কালীর একাধিক রূপভেদ আমরা গ্রন্থ থেকে পাই। তোড়লতন্ত্র মতে, কালী আট প্রকার। যথা: দক্ষিণকালিকা, সিদ্ধকালিকা, গুহ্যকালিকা, শ্রীকালিকা, ভদ্রকালী, চামুণ্ডাকালিকা, শ্মশানকালিকা ও মহাকালী। এছাড়াও মহাকাল সংহিতায় নয় প্রকার, অভিনব গুপ্তের তন্ত্রালোক ও তন্ত্রসার গ্রন্থদ্বয়ে কালী ১৩ প্রকার, জয়দ্রথ যামল গ্রন্থে ১০ প্রকার কালীর উল্লেখ পাওয়া যায়।
-----দক্ষিণাকালীই হল শ্যামা কালী-----
পুরাণ বা তন্ত্র সাহিত্যে আমরা যে বিভিন্ন কালীর রূপের বর্ণনা পাই, তার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হল দক্ষিণাকালী। দক্ষিণদিকের অধিপতি হলেন যম। কালীর ভয়ে যম সর্বদা পলায়ন করেন। তাই তাঁর নাম দক্ষিণাকালী। আবার অন্যমতে, এই কালীকে ভক্তি ভরে পূজা করলে সর্বোৎকৃষ্ট ফল দক্ষিণাস্বরূপ পাওয়া যায়। তাই তাঁর নাম দক্ষিণাকালী। যাইহোক, এই দক্ষিনাকালীই শ্যামাকালী নামে পরিচিত।
-----শ্যামা কালীর রূপ-----
দক্ষিণাকালী বা শ্যামাকালী করালবদনা, মুক্তকেশী, চতুর্ভূজা এবং মুণ্ডমালা বিভূষিতা। তাঁর একটি বাম হাতে রয়েছে নরমুণ্ড ও অন্য বাম হাতে রয়েছে খড়্গ। ডান দিকের একটি হাতে বর ও অন্য হাতে অভয় প্রদান করছেন। তাঁর গাত্রবর্ণ মেঘ বা বিপুল জলরাশির মতো নীল। তাঁর গলায় মুণ্ডমালার হার। কোমরে নরহস্তের মালা। তাঁর দন্ত ভয়ানক, তিনি ত্রিনয়নী এবং মহাদেব শিবের বুকে দক্ষিণপদ স্থাপন করে দণ্ডায়মান।
-----শ্যামা কালি পূজার ইতিহাস-----
আশ্বিন বা কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে আলোর রোশনাই এর মধ্যে শ্যামা কালীর পূজা সূচিত হয়। এই কালী পূজাকে দীপান্বিতা কালীপূজাও বলে। এই উৎসব বিপূল আড়ম্বরে আলোকসজ্জা সহকারে পালিত হয়। এই পূজা খুব বেশী অতীতের নয়। ১৭৬৮ সালে মতান্তরে ১৭৭৭ সালে কাশীনাথ রচিত শ্যামা সপর্যাবিধি গ্রন্থে এই পূজার সর্বপ্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। জনশ্রুতি রয়েছে, নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় অষ্টাদশ শতকে তাঁর সকল প্রজাকে কালীপূজা করতে বাধ্য করেন।
-----পার্থিব জীবন ধারার আঙ্গিকে পর্যালোচনা-----
[১] বিভিন্ন ধর্ম শাস্ত্র গুলি রূপকথা বা কল্প কাহিনীর মধ্য দিয়ে আমাদের বাস্তব জীবনে মূল্যবোধ, ন্যায়, সততা প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছে। তাই পুরান, তন্ত্র ইত্যাদি পৃথিবীতে এসেছে। পুরান বা তন্ত্র থেকে আমরা যে কালী মাহাত্ম্যের কথা জানতে পারি, তার মধ্য দিয়ে বাস্তবেও দুষ্টের দমন ও সত্যের জয় প্রতিষ্ঠার কথাই বলা হয়েছে। কালী মাহাত্ম্যে আসুরিক শক্তির বিনাশ, বাস্তবে অশুভ শক্তির বিনাশেরই সমান।
[২] আবার, নারী শক্তির বিপুলতার প্রকাশ ও নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বাস্তব দিকটিও কালীর মাহাত্ম্যের মধ্য দিয়েই বাস্তবে সূচিত হয়। নারী শক্তির প্রতীক মহাদেবী কালীর বিপুল শক্তিকে অবহেলা করার পরিনাম অসুরদের মুণ্ডুচ্ছেদের মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয়।
[৩] দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষ তার সুপ্ত বিভৎসতা জাগিয়ে তুলে প্রতিরোধ করে। এখানে মহাদেবী কালীও আসুরীয় হিংস্রতার বিরুদ্ধে খড়্গ হাতে রুখে দাঁড়িয়ে বিভৎস হয়ে উঠেছিল। তাই অপরাধীর কাটা মুণ্ডু ও কাটা হাতের মালা পরিধান করা দৃশ্য, তাঁর বিভৎসতার রূপই সূচিত করে।
[৪] আবার অন্যদিকে, এই মহাদেবী কালীই মাতৃরূপে সন্তান স্নেহে আমাদের অভয় ও বর দান করেন। বাস্তব জীবনে নারীজাতির কোমলতা, স্নেহ পরায়নতা মাতৃরূপী কালীর মধ্য দিয়েই সুন্দরী ভাবে পরিস্ফুট হয়।
[৫] পাপীর দেহাংশ নিজের দেহে পরিধানের মধ্য দিয়ে সমস্ত পাপও মাহাদেবী কালী নিজের দেহেই বহন করে। বাস্তব জীবনেও সন্তানের সমস্ত পাপ মা ছাড়া আর কে বহন করতে পারে?
[৬] কালী মাহাত্ম্যেই জানতে পারি, জগতে অমঙ্গল নেমে এলে কালী তার স্বমূর্তিতে আবিভূর্ত হয় এবং অশুভ নাশ করেন। ঠিক তেমনই যখন নিজের সংসারে বা বিশ্ব-সংসারে অমঙ্গল সূচিত হয়েছে, যুগে যুগে নারী শক্তির রুখে দাঁড়ানোর ইতিহাস স্বর্ণাক্ষরে রচিত হয়েছে। প্রয়োজনে সেই নারী দৈহিক শক্তিতে বলবান পুরুষকেও শিবের মতো নিজের পদতলে আনতে দ্বিধা করে না।
-----শেষ কথা-----
যাইহোক, এই মাতৃরূপী শক্তিদায়িনী মহাদেবী কালী আর কেউ নয়, বিশ্ব সংসারে নারীর জাতির প্রতিরূপ মাত্র। আর আজকের সমাজে সেই নারী জাতির উপর নির্যাতন, অত্যাচার বড়ই নির্মম। মহাদেবী কালীই বোধহয় তাঁর তৃতীয় নয়ন বা দিব্যদৃষ্টি দিয়ে যুগ যুগান্তরে নারী জাতির উপর নির্যাতন, পাপাচার আগাম দেখতে পেয়েছিলেন। আর পৃথিবীর মানব সমাজের এই করুণ দশায় হতবাক হয়েই তিনি বিস্ময়ে জিভ কেটেছিলেন।
তথ্যসূত্রঃ কালিকা পুরান, উইকিপিডিয়া, সনাতন ধর্মতত্ত্ব। মতামত লেখকের ব্যক্তিগত।

Wednesday, 17 October 2018

কুমারী পূজা

-----কুমারী মেয়েদের রক্ষা করাই কুমারী পূজার মূল উদ্দেশ্য-----
লেখক- রূপেশ সামন্ত


কুমারী পূজা দুর্গোৎসবের এক বর্ণাট্য অনুষ্ঠান পর্ব। বিশেষত কুমারীকে দেবী দুর্গার পার্থিব প্রতিনিধি হিসেবে পূজা করা হয়ে থাকে।
-----কুমারী পূজা কি?----
কোন কুমারী মেয়েকে দেবী দুর্গার সামনে মাতৃভাবে পূজা করাকে কুমারী পূজা বলে। দুর্গাপূজার মহাষ্টমী পূজার শেষে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়।
-----পৌরাণিক আঙ্গিক----
একদা কোলাসুর স্বর্গ-মর্ত্য অধিকার করে নিয়েছিল। দেবগন বিপন্ন হয়ে পড়েন। তাঁরা মহাকালীর শরণাপন্ন হন। তখন দেবী পুনর্জন্মে কুমারীরূপে আসেন এবং কোলাসুরকে বধ করেন। তখন থেকেই মর্ত্যে কুমারী পূজার প্রচলন শুরু হয়। লেখক- রূপেশ সামন্ত
----পূজার ‘কুমারী’ হওয়ার যোগ্যতা----
কুমারী পূজার জন্য মেয়েকে ষোল বছরের কম বয়সী হতে হবে। অবশ্যই মেয়েকে অরজঃস্বলা হতে হবে। জাতি, ধর্ম বা বর্ণ নির্বিশেষে যে কোন কুমারী মেয়েই কুমারী পূজার যোগ্য হতে পারে। বেশ্যাকুল জাতির কন্যাও কুমারী পূজার ‘কুমারী’ হতে পারে। তবে আগের দিনে মূলত ব্রাহ্মণ কন্যাই পূজিত হত।
----অন্য কোথায় কুমারী পূজা?----
দূর্গা পূজার সময় ছাড়াও কালীপূজা, জগদ্ধাত্রীপূজা এবং অন্নপূর্ণা পূজা উপলক্ষে কুমারী পূজা হয়। এছাড়াও কামাখ্যা শক্তিক্ষেত্রেও কুমারী পূজার প্রচলন রয়েছে। লেখক- রূপেশ সামন্ত
----দার্শনিক তত্বের আলোকে পর্যালোচনা----
কুমারী কন্যা ভবিষ্যতের নারীর বীজাবস্থা মাত্র। বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড তিনটি শক্তির সমাহার- সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়। এই তিনটি শক্তিই সুপ্ত অবস্থায় কুমারী কন্যার মধ্যে নিহিত রয়েছে। তাই কুমারী কন্যা ছাড়া তিনটি শক্তিই আধারহীন হয়ে পড়বে এবং বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডও অস্তিত্বহীন হবে। বর্তমানের কুমারী কন্যা, যে ভবিষ্যতের নারী, তাকে চোখের মনির মতো রক্ষা করতে হবে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই। সেই কারনেই দেবীভাব আরোপ করে কুমারী কন্যার সাধনা করা হয়। এক্ষেত্রে কুমারী কন্যা ভোগ্যা নয়, পূজ্যা। বৃহত্তর অর্থে নারীও ভোগ্যা নয়, এই বিষয়টিও প্রতিষ্ঠা করাও উদ্দেশ্য। এ ভাবনায় ভাবিত হওয়ার মাধ্যমে আমরা রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবকে নিজের স্ত্রীকে ষোড়শীজ্ঞানে পূজা করতে দেখেছি। একজন নারীর শৈশবে রক্ষাকর্তা বাবা-মা, যৌবনে রক্ষাকর্তা স্বামী ও বৃদ্ধাবস্থায় রক্ষকর্তা সন্তান। কিন্তু কন্যাবস্থায় সে অত্যন্ত দুর্বল ও বোধহীন হয়। তাই সে সবচেয়ে অরক্ষিতও হয়। সেই কারনে কুমারী পূজার মাধ্যমে কন্যাকে দেবীভাবে ও শ্রদ্ধাসনে বসানো হয়েছে। ভবিষ্যতের নারীকে রক্ষা করাই উদ্দেশ্য। আবার জাতি, ধর্ম বা বর্ণ নির্বিশেষে যে কোন কুমারী মেয়েকেই কুমারী পূজার যোগ্যতা দানের মধ্য দিয়ে সম্প্রীতির দিকটিও তুলে ধরা হয়েছে। সর্বোপরি কুমারী পূজা মানবাতাবাদী ধর্মাচরন বলেই আমার মনে হয়েছে। লেখক- রূপেশ সামন্ত। ছবি সৌজন্য- বকুল ফুল
তথ্য সূত্র- কুমারী পূজা প্রয়োগ, দেবী পুরান, উইকিপিডিয়া। ছবি সৌজন্য- বকুল ফুল

বাংলাদেশের ভারত বিরোধিতা: আবেগ না রাষ্ট্রবুদ্ধি?

বাংলাদেশের ভারত বিরোধিতা: আবেগ না রাষ্ট্রবুদ্ধি? ✍️ রূপেশ কুমার সামন্ত  বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে সাম্প্রতিক কালে ভা...