Saturday, 14 September 2019

Mock Parliament - Question Hour


নকল বিধান সভা স্ক্রিপ্ট
MOCK YOUTH PARLIAMENT SCRIPT
Script Writer- Rupesh Kumar Samanta


চরিত্র- অধ্যক্ষ (১), সচিব (১), আর্দালি (১), সরকার পক্ষের মন্ত্রী ও বিধায়ক (৭), বিরোধী পক্ষের দলনেতা ও বিধায়ক (৫)

[১]
[সরকার পক্ষের মন্ত্রী ও বিধায়ক এবং বিরোধী পক্ষের দলনেতা ও বিধায়করা সকলে বিধান সভা কক্ষে প্রবেশ করে। সচিবের বসার জায়গায় রাখা খাতায় সই করেন। সরকার পক্ষ ডানদিকে ও বিরোধী পক্ষ বামদিকে নিজের নিজের জায়গায় গিয়ে বসেন। নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করতে থাকেন।]
[অধ্যক্ষের বসার আসনের কাছে মার্শালের প্রবেশ।]

মার্শালঃ  সদস্য মহোদয় ও মহোদয়াগণ, মাননীয় অধ্যক্ষ মহাশয়/ মহাশয়া ...
[সচিব ও অধ্যক্ষ সভাকক্ষে প্রবেশ করেন। সভাকক্ষে উপস্থিত সবাই উঠে দাঁড়ায়। অধ্যক্ষ মহাশয়/ মহাশয়া প্রথমে সরকার পক্ষকে (ডানদিকে) পরে বিরোধী পক্ষকে (বাঁদিকে) নমস্কারের ভঙ্গীতে অভিবাদন জানান। অধ্যক্ষ মহাশয়/ মহাশয়াকে সকলে ঝুঁকে নমস্কারের ভঙ্গিতে অভিবাদন জানান। অধ্যক্ষ মহাশয়া বসলে সকলে বসেন। সচিব গিয়ে নিজের জায়গায় বসেন এবং টেবিলে রাখা ফাইল ও কাগজে মনোযোগ দেন। মার্শাল দণ্ডটি সচিবের সামনের টেবিলে রেখে যান। ফিরে গিয়ে স্পিকারের পাশে বামদিকে মার্শাল বসেন।]

[২]
স্পিকারঃ পাঁশকুড়া পশ্চিম বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে নবনির্বাচিত বিধায়িকা আফরোজা বিবি মহাশয়া শপথ বাক্য পাঠ করবেন।
[নব নির্বাচিত সদস্য সচিবের কাছে গিয়ে কাগজ জমা দিল। ওখানের কাগজ নিয়ে গিয়ে স্পিকারের হাতে দিলে স্পিকার উঠে দাঁড়ান। শপথের জন্য স্পিকার শপথ বাক্য পাঠ করাতে থাকেন।]

স্পিকারঃ আমি…

বিধায়িকাঃবিধানসভার সদস্যা রূপে নির্বাচিত আমি আফরোজা বিবি ঈশ্বরের নামে শপথ করিতেছি ও নিষ্ঠার সহিত প্রতিজ্ঞা করিতেছি যে, আমি বিধি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ভারতের সংবিধানের প্রতি প্রকৃত বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণ করিব, আমি ভারতের সার্বভৌমত্ব ও সংহতি রক্ষা করিয়া চলিব এবং আমি যে কর্তব্যভার গ্রহণ করিতে চলিয়াছি তাহা বিশ্বস্তভাবে নির্বাহ করিব।”
[শপথ গ্রহণ শেষে স্পিকারের সঙ্গে হ্যান্ডসেক/নমস্কার করেন। অন্য সকল সদস্যরা টেবিল চাপড়ে তাঁকে অভিবাদন জানায়। সদস্যা স্পিকারের পিছন দিক দিয়ে এসে সচিবের কাছে দাঁড়ান। কাগজে সই করেন। সচিবের সঙ্গে হ্যান্ডসেক করেন। মুখ্য মন্ত্রীর সঙ্গে হ্যান্ডসেক/ নমস্কার করেন। বিরোধীদলের প্রধানের সঙ্গে হ্যান্ডসেক/ নমস্কার করেন। তারপর নিজের জায়গায় গিয়ে বসেন।]
[৩]
[সচিব গিয়ে একটি কাগজ দিয়ে আসে।]
স্পিকারঃ  আজ সভা শুরুর প্রাক্কালে অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাই যে, ভারতের প্রাক্তন অর্থ ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী অরুণ জেটলি মারা গেছেন। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর দিল্লির এইমস হাসপাতালে গত ২৪শে আগস্ট, ২০১৯ তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৬ বছর। তার কিডনিতে ক্রনিক সমস্যা দেখা দেয়ায় কিডনি প্রতিস্থাপন করতে হয়। এমন শারীরিক প্রতিবন্ধকতার মধ্যেো তিনি প্রথম মোদি সরকারের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীকে আমি ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী অরুন জেটলি সম্পর্কে কিছু বলতে বলছি।

মুখ্যমন্ত্রীঃ ব্যাক্তিগত ভাবে অরুন জেটলির সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। রাজনীতির উর্ধে উঠে বিভিন্ন সময় আমাকে সাহায্যও করেছেন। অটল বিহারি বাজপেয়ি ও নরেন্দ্র মোদি জমানায় অরুণ জেটলি একাধিকবার অর্থ, বাণিজ্য ও আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। জিএসটি, নোটবন্দির মতো একাধিক নীতি প্রণয়ন করেছেন। যদিও আমরা তার বিরোধীতা করেছি। শুধু দক্ষ রাজনীতিবিদ নন, তিনি সুপ্রিমকোর্টের দক্ষ আইনজীবীও ছিলেন। ব্যক্তি অরুন জেটলি একজন খুব বড় মনের মানুষ ছিলেন। আমরা তাঁর অবদান ভুলবে না।

স্পিকারঃ মাননীয়া বিরোধী দলনেতাকে আমি ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী অরুন জেটলি সম্পর্কে কিছু বলতে বলছি।

বিরোধী দলনেতাঃ প্রয়াত এই জননেতা জনসাধারণের জন্য অসামান্য কাজ করেছেন। জনপ্রতিনিধি হিসেবে তার অনুকরণীয় ভূমিকা ছিল। সাধারণ মানুষের জন্য সংসদের ভেতরে ও বাইরে সমান সক্রিয় ছিলেন তিনি। রাজনীতিতে জেটলির অবদান অনস্বীকার্য। অসাধারণ সংসদ সদস্য ও দক্ষ আইনজীবী ছিলেন। সব দলের নেতাদেরই প্রিয়জন ছিলেন তিনি। ভারতের রাজনীতিতে তার অবদান চিরকাল মনে থাকবে।

স্পিকারঃ প্রয়াত অরুন জেটলির বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায় ও তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে সভার সকলকে এক মিনিট নীরবতা পালন করতে অনুরোধ করছি।
[সকলে উঠে দাঁড়ায়।]

[অল্প সময় পরে]
স্পিকারঃ ধন্যবাদ এবার সকলে বসতে পারেন।
[সবাই বসে পড়েন।]

স্পিকারঃ সচিব মহাশয়কে প্রয়াতের পরিবারের প্রতি একটি শোক বার্তা প্রেরণ করতে অনুরোধ জানাই।
[সচিব গিয়ে একটি কাগজ দিয়ে আসে।]


[৪]
স্পিকারঃ এখন শুরু হচ্ছে প্রশ্নোত্তর পর্ব । আমার কাছে মোট ১৭টি প্রশ্ন এসেছে। কিন্তু সময়ের অভাবে ও গুরুত্বের বিচারে মাত্র ৪টি প্রশ্ন আলোচনার জন্য  অনুমোদন করেছি।

স্পিকারঃ অনুমোদিত প্রশ্ন নং ১, বিরোধী দলনেতা

বিরোধী দলনেতাঃ মাননীয়/ মাননীয়া স্পিকার, অর্থ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী মহোদয় অনুগ্রহপূর্বক জানাবেন কি-
রাজ্য সরকারী কর্মীদের ডিএ মামলায় নির্দেশ দিয়েছে স্যাট। কেন্দ্রীয় হারেই ডিএ দিতে হবে রাজ্যকে। রায় ঘোষণা করে স্যাট জানিয়েছে, কীভাবে ডিএ দেওয়া হবে, তার আইন করা রাজ্যের দায়িত্ব। পাশাপাশি আরও বলা হয়েছে, বকেয়া মেটানো রাজ্যের কর্তব্য। হয় নগদে মেটাতে হবে বকেয়া টাকা, নইলে পিএফ অ্যাকাউন্টে তা ট্রান্সফার করে দিতে হবে। এক বছরের মধ্যে অথবা ষষ্ঠ পে কমিশনের রায়ের আগে তা কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছে স্যাট। রায় কি উনি জানেন? যদি জানেন, তবে তাঁর জন্য কি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন?

স্পীকারঃ মাননীয় অর্থ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী... ...

অর্থ মন্ত্রীঃ মাননীয়/ মাননীয়া স্পিকার, রাজ্য সরকারী কর্মীদের ডি.এ. নিয়ে একটা নোংরা রাজনীতির খেলা চলছে…

বিরোধী দলনেতাঃ মাননীয়/ মাননীয়া স্পিকার, এটা কোন নোংরা রাজনীতির কথা বলা হচ্ছে? রাজ্য সরকারী কর্মীদের ন্যাহ্য দাবীর কথা বলছি। ডি.এ. চাইতে গেলে পুলিশ দিয়ে পেটানো হচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রীঃ মাননীয়া স্পিকার, আমাকে বলতে দেওয়া হোক।

স্পীকারঃ মাননীয় ... ..., আপনি শান্ত হোন। আপনাকে বসতে অনুরোধ করছি। আপনার সময়ে আপনি বলবেন।
[নিজের জায়গায় বসে পড়েন]

অর্থ মন্ত্রীঃ ধন্যবাদ মাননীয়/ মাননীয়া স্পিকার।  ডিএ দেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও অর্থের অভাবে ডিএ দিতে পারছে না সরকার। পূর্বতন সরকারের করে যাওয়া ঋণের সুদ দিতেই সরকারের রাজস্বের প্রায় সবটাই চলে যাচ্ছে। কেন্দ্র সরকারও অসহযোগিতা করছে। কারণ সেন্ট্রাল ফিনান্সিয়াল রেসপন্সিবিলিটি অ্যামেন্ডমেন্ট বিল অনুয়ায়ী রাজ্য ৩ শতাংশের  বেশি ধার নিতে পারবে না। ফলে কেন্দ্রের থেকে রাজ্য ধার নিতে পারছে না। সেই জন্য ডিএ দেওয়ার সমস্যা হচ্ছে। ৬ষ্ঠ পে-কমিশনের রিপোর্ট এখনও জমা পড়েনি। পে-কমিশনের রিপোর্ট জমা পড়লেই সরকার পদক্ষেপ করবে।

বিরোধী দলনেতাঃ মাননীয়/ মাননীয়া স্পিকার, মাননীয় অর্থ মন্ত্রী মূল জায়গাটিই এড়িয়ে যাচ্ছেন। স্যাটের রায়ে বকেয়া ডি.এ. দেওয়ার একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। বকেয়া ডি.এ পাওয়া রাজ্য সরকারী কর্মীদের সঙ্গত অধীকার। ডিএ সম্পূর্ণ মূল্যবৃদ্ধির সাথে যুক্ত। কিন্তু অবান্তর যুক্তি দেখিয়ে আসলে রাজ্য এড়িয়ে যেতে চাইছে। দিনের পর দিন মূল্যবৃদ্ধি হলেও রাজ্য সেই অনুপাতে মহার্ঘভাতা বৃদ্ধি করেনি।

স্পিকারঃ মাননীয় ... ..., আপনি আপনার যথাযথ প্রশ্নটি করুন, অযথা বক্তৃতা দিয়ে বিধান সভারর গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট করবেন না।

বিরোধী দলনেতাঃ মাননীয় স্পিকার, মাননীয় অর্থ মন্ত্রীকে আমার প্রশ্ন- স্যাটের রায় অনুসারে কবে থেকে বকেয়া ডিএ দেওয়া হবে?

অর্থ মন্ত্রীঃ স্যাটের দেওয়া সময় সীমা এখনও শেষ হয়নি। ভারতের বিচার ব্যবস্থার উপর সরকারের পূর্ণ আস্থা আছে। বিরোধীরা চাইলে মহামান্য আদালতে আবারও যেতেই পারেন। ধন্যবাদ।

স্পীকারঃ ধন্যবাদ

স্পিকারঃ অনুমোদিত প্রশ্ন নং ২, বিধায়ক... ...

বিধায়কঃ মাননীয়/ মাননীয় স্পিকার, কৃষি বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী মহোদয় অনুগ্রহপূর্বক জানাবে কি-
এই বছর পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় খরার কারনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা কত?
চাষ করা যায়নি এমন জমির পরিমান কত?
এর মোকাবিলায় সরকার কি পদক্ষেপ গ্রহন করেছে?

স্পিকারঃ মাননীয় কৃষি বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী

কৃষি বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রীঃ মননীয়/ মাননীয়া স্পিকার, আমরা সকলে অবহিত আছি, এবছর সারা দেশেই পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হয়নি। গত ১০ বছরে এমন ভয়ংকর পরিস্থিতি পশ্চিমবঙ্গে সৃষ্টি হয়নি। এখনও কৃষকরা চাষ করতে পারেনি। এখনও পাওয়া তথ্য অনুযায়ী এই খরায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ২০ লক্ষ।
খরা জনিত কারনে চাষ করা যায়নি ২৫.২৩ লক্ষ হেক্টর জমিতে।
মাননীয়/মাননীয়া স্পিকার, এই বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য কেন্দ্র সরকারের কাছে আবেদন করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পিছু দু’হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে।

বিরোধী দলনেতাঃ ঐ সামান্য টাকায় কি হবে? আপনারা আর কত কৃষকের আত্মহত্যা দেখতে চান? রাজ্যে একটি কৃষক বিরোধী সরকার চলছে। [বিরোধী পক্ষ বেঞ্চ চাপড়ে সমর্থন করেন]

কৃষি বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রীঃ মাননীয়/ মাননীয়া স্পীকার, আমাকে বলতে বাধা দেওয়া হচ্ছে।

স্পীকারঃ আপনারা শান্ত হোন। [সবাই চুপ করে] এবার আপনি বলুন।

কৃষি বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রীঃ বিগত সরকারে ঋনের বোঝা আমরা বইছি। অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও সরকার কৃষকদের পাশে রয়েছে। আগামী দিনেও থাকবে। ধন্যবাদ।

স্পীকারঃ ধন্যবাদ।

সরকার পক্ষের বিধায়কঃ মাননীয়া স্পিকার, আমি একটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছি।

স্পিকারঃ আপনাকে অনুমতি দেওয়া হল।

সরকার পক্ষের বিধায়কঃ ধন্যবাদ মাননীয়/ মাননীয়া স্পিকার। সংসদের নবনির্বাচিত প্রতিনিধি আফরোজা বিবি বিধান সভায় সেলফি তুলছেন। মোবাইল নিয়েই ব্যস্ত আছেন।

স্পিকারঃ মাননীয় বিধায়িকা, বিধানসভা চলাকালীন সদস্যদের কাছথেকে যথোপযুক্ত আচরণ কাম্য। বিধানসভা চলাকালীন মোবাইল ব্যবহার নিষিদ্ধ।

বিধায়কঃ আমি অত্যন্ত দুঃখিত মাননীয়/ মাননীয়া স্পিকার। ভবিষ্যতে এমন আচরণ আর হবে না।

স্পিকারঃ ধন্যবাদ বিধায়িকা আফরোজা বিবি।

স্পিকারঃ অনুমোদিত প্রশ্ন নং ৩, বিধায়ক... ...

বিধায়কঃ মাননীয়/ মাননীয়া স্পিকার, স্বাস্থ্য বিভাগের দায়ত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর কাছে আমার প্রশ্ন, এবছর কতজন মানুষের বজ্রপাতে  ও সর্পদংশনে মৃত্যু হয়েছে? জীবন রক্ষায় সরকার কি পদক্ষেপ করছে?

স্পিকারঃ মাননীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রী... ...

স্বাস্থ্য মন্ত্রীঃ মাননীয়া স্পিকার, আমরা ক্ষমতায় আসার পর যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে বিষয় গুলি দেখা হচ্ছে। এই বছর এখনও পর্যন্ত পশ্চিম বঙ্গে ২১৭ জন মানুষের বজ্রপাতে মৃত্যু হয়েছে। সর্পদংশনে এবছর ৮২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের পরিবারকে সরকার এক লক্ষ টাকা  করে ক্ষতিপূরণ দেয়।

বিধায়কঃ কিন্তু সরকার মানুষের জীবন রক্ষায় কি পদক্ষেপ করছে?

স্বাস্থ্যমন্ত্রীঃ মাননীয়/মাননীয়া স্পীকার, আমাকে বলতে বাধা দেওয়া হচ্ছে।

স্পীকারঃ মাননীয় বিধায়ক... , আপনি শান্ত হোন। [চুপ করে যায়] এবার আপনি বলুন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রীঃ মানুষের চেতনার অভাব রয়েছে। বজ্রপাতের সময় খোলা জায়গায় থাকা উচিৎ নয়, এটা মানুষের বোঝা উচিত। তাই বজ্রঘাতে মৃত্যু বাড়ছে। মানুষের অজ্ঞতা, কুসংস্কার ঘোচেনি। পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে, গত তিন বছরে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় সাপের কামড়ে মৃতদের ৯০ শতাংশ প্রথমেই ওঝা, গুণিনের শরণাপন্ন হয়েছেন। সরকার একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গড়েছে। তাদের ৬ মাসের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। তারপরই সরকার যথোপযুক্ত পদক্ষেপ করবে। ধন্যবাদ।

স্পিকারঃ অনুমোদিত প্রশ্ন নং ৪, বিধায়ক... ...
বিধায়কঃ মাননীয়/ মাননীয়া স্পিকার, মাননীয়া মুখ্য মন্ত্রীর কাছে আমার প্রশ্ন, পাঁশকুড়ার সব্জী মার্কেট পশ্চিম বঙ্গের অন্যতম বড় পাইকারি বাজার। পাঁশকুড়া একটি পৌরসভা এলাকা। দীর্ঘদিন ধরে পাঁশকুড়ার লেভেল ক্রসিংয়ে উড়াল পুল নির্মিত হচ্ছে না। প্রতিদিন দু’শো জোড়া ট্রেন যাতায়াত করে। পাঁশকুড়ার গতি আজ রুদ্ধ। উড়াল পুল নির্মানের জন্য রাজ্য সরকার জমি অধিগ্রহন বা অর্থ দিচ্ছে না কেন?

স্পিকারঃ মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী... ...

স্বাস্থ্য মন্ত্রীঃ মাননীয়া স্পিকার, বিষয়টি নিয়ে ওরা নোংরা রাজনীতি করছে। এটি আমাদের বিষয়ই নয়। এটি কেন্দ্রের বিষয়।

বিধায়কঃ কিন্তু কেন্দ্রীয় রেল প্রতিমন্ত্রী সম্প্রতি পাঁশকুড়ায় এসে কেন্দ্র প্রকল্পের মোট খরচের অর্ধেক টাকা দেওয়ার কথা ঘোষণা করে গেছেন। রাজ্যের অর্ধেক টাকা দেওয়ার দায়িত্ব পালনের কথা শুনিয়ে গেছেন। 

মুখ্যমন্ত্রীঃ আপনারা এতো বছর ক্ষমতায় ছিলেন। তখন করেননি কেন? আপনি আচরি ধর্ম! আমাদের উপদেশ দিতে হবে না। আমাদের সরকার মানুষের সরকার। মানুষের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা আছে। ওখানে জমি অধিগ্রহন করলে বহু মানুষের ঘরবাড়ি পড়ে যাবে। আমরা জোর করে জমি অধিগ্রহনের বিরোধী।  

বিরোধী দলনেতাঃ জমি অধিগ্রহন না করলে উন্নয়ন হবে কি করে? সিঙ্গুরকে তো শ্মশান বানিয়ে দিয়েছেন। [দুই পক্ষের হইচই, টেবিল চাপড়ানো ও গণ্ডগোল শুরু হয়ে যায়।]

স্পীকারঃ আপনারা শান্ত হোন। শান্ত হোন। [সবাই চুপ করে যায়]
মুখ্যমন্ত্রীঃ আমাদের ঐ এলাকার সাংসদ রেল মন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছেন। কেন্দ্রের পদক্ষেপ অনুযায়ী আমরা পদক্ষেপ করবো। তবে সাধারণ মানুষের যাতে অসুবিধা না হয়, এটা মাথায় রাখতে হবে। থ্যাংক ইউ।
স্পীকারঃ ধন্যবাদ
[৫]
বিরোধী দলের বিধায়কঃ মাননীয়/মাননীয়া অধ্যক্ষ মহাশয়/ মহাশয়া, আমি মুলতুবি প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য অনুমতি প্রার্থণা করছি।

স্পিকারঃ হ্যাঁ, এখন মুলতুবি প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য আপনাকে আহ্বান জানাচ্ছি।

বিধায়কঃ মাননীয়া স্পিকার, বর্তমান রাজ্য সরকার এন.আর.সি. বা নাগরিক পঞ্জি তৈরির বিরোধিতা করছে। দেশের স্বার্থেই পশ্চিমবঙ্গে এন.আর.সি. বা নাগরিক পঞ্জি তৈরির উদ্যোগ গৃহীত হোক। আমি এই বিষয়ে মুলতুবি প্রস্তাব উত্থাপনের অনুমতি প্রার্থনা করছি।

স্পিকারঃ প্রশ্ন হল যে মাননীয়া সদস্যাকে মুলতুবি প্রস্তাব উত্থাপনের অনুমতি দেওয়া হোক। যারা প্রস্তাবের পক্ষে তারা উঠে দাঁড়ান।
[বিরোধী পক্ষের কয়েকজন উঠে দাঁড়ায়।]

স্পিকারঃ ধন্যবাদ।
[সকলে বসে পড়েন।]

স্পিকারঃ যেহেতু পার্লামেন্টের এক দশমাংশের বেশী সদস্য মুলতুবি প্রস্তাব উত্থাপনের পক্ষে তাই মুলতুবি প্রস্তাব উত্থাপনের অনুমতি দেওয়া হল।

বিরোধী দলের বিধায়কঃ মাননীয়া স্পিকার, পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা অনেক বেশি। তাদের চিহ্নিত করে এখান থেকে বিতাড়ন করতে হবে। আসামের নাগরিক পঞ্জিকরণ নিয়ে ঘোলা জলে মাছ ধরতে নেমে পড়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। এসব না করে এই রাজ্যেও এনআরসি প্রক্রিয়া শুরু করুক রাজ্য সরকার। এখানে অনুপ্রবেশকারী মুসলিমদের ভোট ব্যাংক হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি সমাজে বিভিন্ন ধরনের জেহাদি কার্যকলাপ বাড়ছে। পাশাপাশি বাংলার ভূমিপুত্রদের সরকারী সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তিতে অনুপ্রবেশকারীদের জন্য সুযোগ কমছে। দেশ ও রাজ্যের স্বার্থ সুরক্ষিত করতে অবিলম্বে এন আর সি প্রক্রিয়া শুরু করু রাজ্য।

স্পিকারঃ মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী, আপনি বিষয়টি বিবেচনা করে উত্তর দেবেন।

মুখ্যমন্ত্রীঃ এন আর সি করে দেশে গৃহযুদ্ধ লাগানোর চেষ্টা চলছে। পশ্চিমবঙ্গে ১৯৭১ সালের পর থেকে বড় সংখ্যায় অনুপ্রবেশ ঘটেনি। তাছাড়া প্রশ্নটি হল মানবিকতার। এই ভাবে মানুষের ভবিষ্যত নিয়ে ছিনিমিনি খেলা একটি অপরাধ। ওরা রাজনীতির কারনে দেশে বিভাজন করতে চাইছে। আমরা তা হতে দেব না। আমরা শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে এন আর সি রুখব।

বিরোধী দলের সদস্যঃ তার মানে আপনারা বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীদের বিতাড়ন করতে চাইছেন না।

সরকারী দলের বিধায়কঃ কেন্দ্রীয় সরকার এবং এন আর সি কর্তৃপক্ষ মিলে নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার চক্রান্ত করছে। পুঁজিপতি গোষ্ঠীর স্বার্থে জল-জমি-জঙ্গল কেড়ে নেওয়ার চক্রান্ত করছে। অধিকারহীন সস্তার শ্রমিক বানাবার জন্য এ-জাতীয় নাগরিকদের নাগরিকত্বহীন করে দেওয়ার চক্রান্ত করছে।

বিরোধী দলের বিধায়কঃ বাংলাদেশ থেকে আসা অনুপ্রবেশকারীদের দেশছাড়া করতে হবে। বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসা অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের এক এক করে চিহ্নিত করতে হবে এবং তাদের বহিষ্কার করতে হবে।
পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী মুসলমানদের এনআরসি সমর্থনের ডাক দিয়েছিলেন। আমরা এ রাজ্যে ক্ষমতায় এলে আসামের মতই এনআরসি তালিকা প্রকাশ করব।

মুখ্যমন্ত্রীঃ মাননীয়া স্পিকার, কেন্দ্রীয় সরাষ্ট্রমন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী হংসরাজ আহির একটি লিখিত জবাবে সংসদে জানিয়েছেন, “১৯৫১ সালের এনআরসি ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন এবং ২০০৩ সালের নাগরিকত্ব বিধির আওতায় আসামে পরিমার্জিত হচ্ছে। বর্তমানে আসাম ছাড়া অন্য কোনও রাজ্যে এনআরসি লাগু করার প্রস্তাব নেই।” ফলে এন আর সি নিয়ে রাজ্য সরকারের পদক্ষেপ করার কোন প্রশ্নই আসে না। [সরকার পক্ষ টেবিল চাপড়ায়]

স্পিকারঃ মাননীয় বিধায়ক, আপনাকে মুলতুবি প্রস্তাবের জবাবি ভাষণ দেওয়ার অনুরোধ করা হচ্ছে।

বিরোধী দলের বিধায়কঃ মাননীয়া স্পিকার, রাজধানী দিল্লীসহ পশ্চিমবঙ্গ, অসম এবং দেশের অন্যান্য রাজ্যেগুলিতে আড়াই-তিন কোটি ‘বাংলাদেশী' মানুষ বে-আইনীভাবে বসবাস করছে। পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কিন্তু বাংলাদেশী বিতাড়নের ক্ষেত্ৰে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ফলপ্ৰসূ কাৰ্য্যক্রম গ্ৰহণ করেনি। সারা দেশের মধ্যে বাংলাদেশী সমস্যায় জৰ্জরিত রাজ্য হিসাবে পশ্চিমবঙ্গের পরেই অসমের স্থান। অসম এন আর সি করতে পারে, পশ্চিমবঙ্গ পারে না। এখানে সরকার পক্ষ রাজনৈতিক ভোটব্যাংকের স্বার্থে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিচ্ছে। তাই দেশ ও রাজ্যের স্বার্থ সুরক্ষিত করতে অবিলম্বে এন আর সি প্রক্রিয়া শুরু করু রাজ্য- এই মর্মে আমি মুলতুবি প্রস্তাব রাখছি।

স্পিকারঃ মুলতুবি প্রস্তাবটি আলোচিত হল। যারা মুলতুবি প্রস্তাবকে সমর্থন করছেন, তারা হ্যাঁ বলুন।
[বিরোধী দলের সকলে ‘হ্যাঁ’ বলে।]

স্পিকারঃ যারা মুলতুবি প্রস্তাবটির বিরোধিতা করছেন তারা ‘না’ বলুন।
[সরকার পক্ষের সকলে ‘না’ বলে]

স্পিকারঃ ধ্বনিভোটের ভিত্তিতে মুলতুবি প্রস্তাবটি বাতিল করা হল।
[সরকার পক্ষের সকলে টেবিল চাপড়ায়]
[সচিব গিয়ে একটি কাগজ দিয়ে আসেন।]
[৬]
স্পীকারঃ বিরোধী দলের বিধায়কদের কাছ থেকে তিনটি বিষয়ের দৃষ্টি আকর্ষণী প্রস্তাব এসেছে। চারটি বিষয়ের মধ্য থেকে গুরুত্ব অনুসারে মাননীয় বিধায়ক … ……………… মহাশয়কে  দৃষ্টি আকর্ষণী প্রস্তাব উত্থাপনের অণুরোধ জানাই।

বিরোধীপক্ষের বিধায়কঃ ধন্যবাদ মাননীয়/ মাননীয়া স্পিকার। আমি বিনপুর বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক। আমি নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষন করতে চাইছি: পশ্চিম মেদিনীপুর পিছিয়ে পড়া জেলা গুলির মধ্যে অন্যতম। অনেকচেষ্টা করেও এই জেলার রক্তাল্পতায় আক্রান্ত শিশু-কিশোরের সংখ্যা কমানো যাচ্ছে না। ৭০% ছাত্রছাত্রী রক্তাল্পতার শিকার। শুধু ছাত্রছাত্রী নয়, প্রসুতি মায়েরাও রক্তাল্পতার শিকার। মাননীয় মন্ত্রীর কাছে অনুরোধ পিছিয়ে পড়া জেলা গুলির ক্ষেত্রে নতুন স্বাস্থ্য নীতি ঘোষণা করা হোক।

স্পিকারঃ মাননীয়া স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে উত্তর দিতে অনুরোধ করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীঃ মাননীয়া স্পিকার, আমি আগামী অধিবেশনে বিষয়টি নিয়ে উত্তর দেওয়ার অনুমতি ও সময় চাইছি।

স্পিকারঃ মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী আপনাকে অনুমতি দেওয়া হল।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীঃ ধন্যবাদ মাননীয়/ মাননীয়া স্পিকার।

স্পিকারঃ এরপর গুরুত্ব অনুসারে মাননীয় বিধায়ক … ……………… মহাশয়কে  দৃষ্টি আকর্ষণী প্রস্তাব উত্থাপনের অণুরোধ জানাই।

বিরোধীপক্ষের বিধায়কঃ ধন্যবাদ মাননীয় স্পিকার। আমি ময়না বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক। আমি শিক্ষামন্ত্রীর মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষন করতে চাইছি: সামাজিক কারণে মহিলারা ঋতুকালীন শারিরীক ও স্বাভাবিক ঘটনা আজও লজ্জায় লুকিয়ে রাখে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নিয়মিত শারীরিক এই প্রক্রিয়া লুকিয়ে এসেছেন মহিলারা। ওষুধের দোকানে স্যানিটারি ন্যাপকিন এখনও বিক্রি করা হয় কাগজে মুড়ে, কালো পলিথিনে ভরে। আজও মহিলারা অস্বাস্থ্যকর প্রাচীন পন্থা অবলম্বন করে। ফলে নানান জটিল স্ত্রী-রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রীরা এর কু-প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর কাছে আবেদন, অবিলম্বে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্যানিটারি ভেণ্ডিং মেশিন সরবরাহ করা হোক।
স্পিকারঃ মাননীয়া শিক্ষা মন্ত্রীকে উত্তর দিতে অনুরোধ করা হচ্ছে।

শিক্ষামন্ত্রীঃ মাননীয়/ মাননীয়া স্পিকার, এ বিষয়ে সরকার একটি সুসংহত পরিকল্পনা গ্রহন করেছে। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় সচেতনতা মূলক প্রচার ও স্যানিটারি ভেণ্ডিং মেশিন সরবরাহের কাজ করবে। খুব শীঘ্রই প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। আশা করা যায়, আগামী অর্থ বর্ষের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।
স্পিকারঃ ধন্যবাদ
শিক্ষামন্ত্রীঃ ধন্যবাদ মাননীয়/ মাননীয়া স্পীকার।
স্পিকারঃ দৃষ্টি আকর্ষণী প্রস্তাব পর্যায়টি এখানেই শেষ হল।
[৭]
স্পিকারঃ মাননীয়  ......................... মহাশয়কে  উল্লেখ পর্বের প্রশ্ন উত্থাপনের অণুরোধ জানাই।

বিধায়কঃ ধন্যবাদ মাননীয়/ মাননীয়া স্পীকার। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিকতিবৃষ্টি ও কিছু জায়গায় বন্যাতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১০ লক্ষ। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষিজাত ফসলের আর্থিক মূল্য ১০হাজার কোটি টাকা। এখন প্রশ্ন হল ২০১৯ সালের জন্য পশ্চিমবঙ্গের কৃষকদের কৃষি ঋণ মুকুব না করলে তাঁরা চরম সংকটের মুখোমুখি হবেন। তাদের প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও আবেদন করছি। বিভাগীয় মন্ত্রীকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করতে অনুরোধ করছি।

স্পিকারঃ মাননীয় কৃষি মন্ত্রীকে উত্তর দিতে অনুরোধ করছি।

কৃষিমন্ত্রীঃ মাননীয়/ মাননীয়া স্পীকার, এই দক্ষিণ ভারতের সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের জন্য কৃষি ঋণ মুকুবের ব্যবস্থা নেওয়া এখনও সম্ভব হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সংখ্যা এখনও যেহেতু বেড়ে চলেছে, তাই সঠিক পরিসংখ্যান না পাওয়া পর্যন্ত যথাযথ মত দেওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব। আমি বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী অধিবেশনে বলার অনুমতি চাইছি।

স্পিকারঃ মাননীয়া কৃষি মন্ত্রী আপনাকে অনুমতি দেওয়া হল।

কৃষিমন্ত্রীঃ ধন্যবাদ মাননীয়/ মাননীয়া স্পীকার।

স্পীকারঃ মাননীয়  বিরোধীপক্ষের বিধায়ক.................... মহাশয়কে  উল্লেখ পর্বের প্রশ্ন উত্থাপনের অ।নুরোধ জানাই।

বিরোধীপক্ষের বিধায়কঃ মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় রাজ্যে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে শিশুসহ ২১ থেকে জনের মৃত্যু হয়েছে। আমরা তো দেখতে পাচ্ছি এটা মহামারি আকারে রূপ নিতে বাকি নেই। মশা নিয়ন্ত্রণে সরকার  কী পদক্ষেপ নিয়েছে এবং সে সব পদক্ষেপের কার্যকারিতা কতটা?

স্পীকারঃ ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রীকে উত্তর দিতে অনুরোধ  করছি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীঃ মাননীয়া স্পীকার, ডেঙ্গু পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রনে রয়েছে। ডেঙ্গু জ্বরে মৃত্যুর তথ্য সঠিক নয়। আমার কাছে স্বাস্থ্য দপ্তরের রিপোর্ট রয়েছে। ডেঙ্গু জ্বরে এপর্যন্ত মৃত্যুর খবর নেই। সরকার সবরকম সচেতনতা মূলক পদক্ষেপ করছে। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্র গুলিতে প্রয়োজনীয় ঔষধ ও রক্ত পরীক্ষার কীট মজুত রয়েছে। উদ্বেগের কোন কারন নেই।

স্পিকারঃ ধন্যবাদ

স্বাস্থ্যমন্ত্রীঃ ধন্যবাদ মাননীয়/ মাননীয়া স্পীকার।
[৮]
স্পিকারঃ বিধানসভার প্রথম পর্বের সমাপ্তি হল। এখন সভার দ্বিতীয় পর্বের অধিবেশন শুরুর আগে জীরো আওয়ার আলোচনার অনুমতি দেওয়া হল।

বিরোধীপক্ষের বিধায়কঃ শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর সংখ্যার নিরিখে রাজ্যের শিক্ষা পরিকাঠামোর হাল এমনই করুণ যে, কোনও মতে জোড়াতালি দিয়ে চলতে গিয়ে হিমসিম খাচ্ছে ওই সব প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন স্কুল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, স্কুলের দৈনন্দিন হিসাবপত্র থেকে শিক্ষকদের বেতন সংক্রান্ত রিক্যুইজিশন তৈরি, ভর্তি প্রক্রিয়া, প্রভিডেন্ট ফান্ডের কাজের মতো দায়িত্ব স্কুল গুলিকে সামলাতে হয়। তার উপর বর্তমানে মিড-ডে-মিল, কন্যাশ্রী, শিক্ষাশ্রী, ঐক্যশ্রী, সবুজ সাথী, স্বপ্নভোর প্রকল্পের কাগজপত্র সামলানোর কাজও স্কুল গুলিকে করতে হচ্ছে। এই সব কাজের সূত্রে কখনও ডিআই বা এডিআই অফিস, কখনও বিডিও অফিস, কখনও এসআই অফিসে যাতায়াত করতে হয়। ফলে এই সব কাজ সামলাতে প্রাণান্তকর অবস্থা হচ্ছে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের। এ ভাবে চলতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট স্কুল গুলিতে পঠন পাঠন মার খাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পড়ুয়ারা। এ হেন পরিস্থিতিতে শিক্ষক-শিক্ষিকা থেকে ছাত্রছাত্রী সকলেই ক্ষুব্ধ। কিন্তু এর সমাধান কি?

শিক্ষামন্ত্রীঃ মাননীয়া স্পীকার, শুধু নেগেটিভ দিকটাই বললেন। রাজ্যের সব জেলায় স্কুল ছুটের সংখ্যা গত বছর গুলিতে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এ রাজ্যের ছেলেমেয়েদের স্কুলে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। শিশুদের স্কুলে পাঠানোর পরিবারের অনুপাত ১০০ শতাংশ ছুঁয়েছে। এমনই তথ্য উঠে এসেছে ইউনিসেফের রিপোর্টে। কন্যাশ্রী, সবুজ সাথী, সর্ব শিক্ষা মিশনের মত প্রকল্পের জন্যই এটা সম্ভব হয়েছে  বলে  ‘ দ্য স্টেট অফ দ্য ওয়ার্ল্ড"জ চিল্ড্রেন রিপোর্ট-’এ দাবি করা হয়েছে  রিপোর্টে বিশেষভাবে কন্যাশ্রী প্রকল্পের প্রশংসা করা হয়েছে। একদিকে মেয়েদের স্কুলে গিয়ে পড়াশোনা শেষ করতে উৎসাহ দিচ্ছে কন্যাশ্রী আর অন্যদিকে, এই প্রকল্পে আটকানো যাচ্ছে কম বয়সে বিয়েও ৷ শিক্ষকরা সমাজ গড়ার কারিগর। ছাত্রছাত্রীদের কল্যান সাধনে সামাজিক প্রকল্প গুলির সঠিক রূপায়নে শিক্ষকরা আগামী দিনেও দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।

স্পিকারঃ ধন্যবাদ

শিক্ষামন্ত্রীঃ ধন্যবাদ মাননীয়/ মাননীয়া স্পিকার।







[৯]
স্পীকারঃ মাননীয় বিরোধী দলনেতা মন্ত্রীসভার উপর অনাস্থা প্রস্তাব এনেছেন। যারা এই অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপনের পক্ষে তারা উঠে দাঁড়ান।
[বিরোধী দলের সকলে উঠে দাঁড়ান।]

স্পীকারঃ যেহেতু বিধানসভার এক দশমাংশের বেশী সদস্য অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপনের পক্ষে, তাই অনাস্থা প্রস্তাব আলোচনার জন্য অনুমতি দেওয়া হল।

বিরোধী দলনেতাঃ ধন্যবাদ মাননীয়/ মাননীয়া স্পীকার। এই সভা মন্ত্রি পরিষদের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করছে। রাজ্যের নানা ক্ষেত্রে নানান শ্রেণির মানুষ এই সময়ে দাঁড়িয়ে নিরাপত্তাহীনতা বোধ করছেন। রক্তাক্ত বাংলা। রাজনৈতিক হিংসার বলি হতে হল দুইজনকে, আহত আরও তিনজন। কলকাতা থেকে মাত্র ৩০ কিমি দূরে ভাটপাড়ায় ঘটল ঐ হিংসার ঘটনা। এই হিংসার ঘটনার সময় বোমাবাজির পাশাপাশি চালানো হয় গুলিও। পরিস্থিতি সামাল দিতে কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়ে পুলিশ, শূন্যে গুলিও ছোঁড়ে তাঁরা। ভাটপাড়া, জগদ্দল, সন্দেশখালি থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক মধ্যমগ্রাম, নানুরের ঘটনা, রাজনৈতিক হিংসার জেরে একের পর এক প্রাণহানি হচ্ছে। এছাড়া ধর্মের নিরিখে যে বিভ্রান্তিকর পরিবেশের সৃষ্টি করা হচ্ছে তাতে সব ধর্মের মানুষ অসহায় বোধ করছেন। চলতি বছরের রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ১৫০টি সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা ঘটেছে। লাগাতার রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনায় রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রশ্নে রাজ্য সম্পূর্ণ ব্যর্থ। মাননীয়া স্পীকার গত কয়েক মাস ধরে ঘটে চলা সারা রাজ্যের ঘটনা গুলিই  মন্ত্রীসভার উপর আস্থার  অভাব রাখছে। প্রত্যেকটি ঘটনায় সরকার চুপ থেকে বুঝিয়ে দিয়েছেন তাঁরা সেই অরাজকতার পক্ষে। এই সভা মন্ত্রী পরিষদের প্রতি তাই অনাস্থা প্রকাশ করছে।

স্পীকারঃ মন্ত্রীসভার প্রধান মাননীয় মুখ্য মন্ত্রীকে তাঁর উত্তর দিতে অনুরোধ করছি।

মুখ্যমন্ত্রীঃ কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নিয়ে সামগ্রিক রাজ্যের বিচার করার চেষ্টা যে হাস্যকর। ৯ কোটি জনসংখ্যার এই রাজ্যের মাত্র কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে অনাস্থা আনা যায়না। এই ঘটনা গুলির জন্য সরকার দায়ী নয়। প্রত্যেকটি ঘটনায় অপরাধীদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনা গুলি বিচারধীন। সরকার কোনোভাবেই সেই বিচার পক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করবে না।

বিরোধীপক্ষের বিধায়কঃ মুখ্যমন্ত্রী কি ভুলে গেলেন কি নির্মম ভাবে বিরোধী দলের সাংসদকে মারা হল। মুখ্যমন্ত্রী কি ভুলে যাচ্ছেন, প্রকাশ্য দিবালোকে কিভাবে আপনার নিজের দলের কর্মীরা গোষ্ঠীদন্দ্বে খুন হচ্ছেন।

মুখ্যমন্ত্রীঃ প্রতিটি মৃত্যুই দুঃখজনক। এইসব ঘটনার পেছনে আপনাদের উস্কানি রয়েছে। আপনারা ঘোলা জলে মাছ ধরতে চাইছেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে সরকার কোন ভাবেই এমন ঘটনাকে সমর্থন করে না। কঠোর ভাবেই মোকাবিলা করা হবে। ভারতের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে যে অধিকার দিয়েছে, আমাদের সরকার সেই অধিকার রক্ষায় বদ্ধপরিকর।

স্পিকারঃ বিরোধী দলনেতাকে জবাবী ভাষণ দিতে অনুরোধ করছি।

বিরোধী দলনেতাঃ গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রাজ্যে যে সংঘর্ষ চলছে, তা প্রশমিত করতে না পারা রাজ্যের ব্যর্থতা। রাজ্যবাসীর আস্থা অর্জনে আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ব্যর্থ। শুধু তাই নয়, এই ঘটনা নিয়ে ইতিমধ্যে রাজ্যের থেকে বিস্তারিত রিপোর্ট চেয়ে পাঠিয়েছে কেন্দ্র। রাজ্যের কোথায় শান্তি নেই। গোটা রাজ্যজুড়ে সন্ত্রাস চলছে। বিরোধী দলের কর্মীদের মারধর করা হচ্ছে। এই সভা মন্ত্রিসভার প্রতি আস্তার অভাব প্রকাশ করছে মাননীয়া স্পীকার।

স্পিকারঃ অনাস্থা প্রস্তাবটি আলোচিত হল। যারা অনাস্থা প্রস্তাবকে সমর্থন করছেন, তারা হাত তুলুন।
[বিরোধী দলের সকলে হাত তোলেন]

স্পিকারঃ ধন্যবাদ। এবার যারা অনাস্থা প্রস্তাবটির বিরোধিতা করছেন তারা হাত তুলুন।
[সরকার পক্ষের সকলে হাত তোলেন]

স্পিকারঃ সংখ্যা গরিষ্ঠের সমর্থন অনাস্থার  বিপক্ষে থাকায় এই সভা সরকারের উপর আস্থা বজায় রাখছে।  সভা সরকারের উপর আস্থা বজায় রাখছে।
[সরকার পক্ষের সকলে টেবিল চাপড়ায়]

[সচিব গিয়ে একটি কাগজ দিয়ে আসেন।]














[১০]
স্পিকারঃ এখন জনস্বার্থ সম্বন্ধীয় জরুরী আলোচনায় অংশগ্রহনের জন্য মাননীয় বিধায়ক ......................... তাঁর প্রশ্ন রাখতে অনুরোধ করছি।

বিরোধী দলের বিধায়কঃ মাননীয়া স্পীকার, আমি আপনার অনুমতি নিয়ে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীকে প্রশ্ন করতে চাই।

স্পিকারঃ  আপনাকে অনুমতি দেওয়া হল।

বিরোধী দলের বিধায়কঃ আপনারা বলছেন, অর্থাভাব আমাদের রাজ্যের জ্বলন্ত সমস্যা। অর্থাভাবের কারণে ঘোষিত প্রকল্প গুলিতে বরাদ্দ টাকা দিতে পারছেন না। সরকারী কর্মীদের ভাতা দিতে পারছেন না। পরিকাঠামো উন্নয়ন তলানিতে। বিপরীতে দেখছি অন্য চিত্র। ক্লাব গুলিকে যথেচ্চ অনুদান দেওয়া হচ্ছে। পূজা কমিটিকে টাকা দেওয়া হচ্ছে। সরকারী খরচে চলছে মেলা, খেলা। মুখ্যমন্ত্রীর প্রশাসনিক মিটিংয়ে বিলাসবহুল আয়োজন হচ্ছে। সরকারী কোষাগারের এই অপব্যবহার কেন?

স্পিকারঃ মাননীয়/ মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীকে উত্তর দিতে অনুরোধ করছি।

মুখ্যমন্ত্রীঃ মাননীয় স্পীকার, যাদের টাকা দেওয়া হচ্ছে, তারা ছোট্ট ছোট্ট ছাত্র-যুব। কখনও তারা দুর্গাপুজো, কখনও কালীপুজো, কখনও বা ঈদ, বড়দিনের উৎসবে মেতে ওঠে। মাল্টিজিম, বিচিত্রানুষ্ঠান করে। ওই সব ভাইবোনেরা আমাদের সংস্কৃতি ধরে রেখেছে। আমি পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী উৎসাহ দিতে চেয়েছি, যে ছাত্র-যুবরা দেশের ভবিষ্যত। ওরাই একদিন নবজাগরণ আনবে।
[সরকার পক্ষের সকলে টেবিল চাপড়ায়]
স্পিকারঃ ধন্যবাদ
মুখ্যমন্ত্রীঃ ধন্যবাদ আপনাকেও, মাননীয়/ মাননীয় স্পিকার।

স্পিকারঃ এখন জনস্বার্থ সম্বন্ধীয় জরুরী আলোচনায় অংশগ্রহনের জন্য মাননীয় বিধায়ক ....................প্রশ্ন রাখতে অনুরোধ করছি।
বিরোধী দলের বিধায়কঃ ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো রেলের সুড়ঙ্গ তৈরির কাজের জন্য বৌবাজার এলাকায় হঠাৎ ভেঙে পড়ে বেশ কয়েকটি পুরনো বাড়ি। তৎক্ষণাৎ বাড়ি খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়। আর এরপরই সংশ্লিষ্ট বাড়ি গুলির বাসিন্দারা কার্যত একবস্ত্রে বাড়ি ছেড়ে সরে যায়। বর্তমানে তারা গৃহহীন। সরকার কি ব্যবস্থা গ্রহন করেছে?
মুখ্যমন্ত্রীঃ সরকার অসহায় গৃহহীন মানুষদের পাশে রয়েছে। গৃহহীন মানুষদের হোটেলে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় ত্রানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আগামীদিনে মেট্রো কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ওই জায়গায় নতুন করে বাড়ি তৈরি করে দেওয়া হবে। তবে তা সময়সাপেক্ষ।
স্পিকারঃ ধন্যবাদ
মুখ্যমন্ত্রীঃ ধন্যবাদ আপনাকেও, মাননীয়/ মাননীয় স্পিকার।
স্পিকারঃ জনস্বার্থ সম্বন্ধীয় জরুরী আলোচনাটি এখানেই শেষ হল।
[১১]
স্পীকারঃ মাননীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রী মহাশয়কে সভায় বিল উত্থাপনের অনুরোধ জানাই।

স্বাস্থ্য মন্ত্রীঃ মাননীয়া স্পীকার, মেয়েদের স্বাস্থ্য ও অধিকার সংক্রান্ত– ‘আলোশ্রী’ বিল, ২০১৯ সভায় উত্থাপন করার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করছি।

স্পীকারঃ মাননীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রী মহাশয়কে মেয়েদের স্বাস্থ্য ও অধিকার সংক্রান্ত– ‘আলোশ্রী’ বিল, ২০১৯ সভায় উত্থাপন করার জন্য অনুমতি দেওয়া হল।

স্বাস্থ্য মন্ত্রীঃ মেয়েদের স্বাস্থ্য ও অধিকার সংক্রান্ত ‘আলোশ্রী’ বিল, ২০১৯ সভায় বিবেচনার জন্য পেশ করছি।

‘আলোশ্রী’ বিল, ২০১৯
ক- ধারায়- কন্যা ভ্রূণের লিঙ্গ নির্ধারণ যারা করবে, তাদের ১ লক্ষ টাকা জরিমানা ও আজীবন কারাদণ্ড দেওয়া হবে।
খ- ধারায়- কন্যা সন্তান জন্মালে পঞ্চায়েতের উদ্যোগে শিশু উৎসব পালন করা হবে।
গ- ধারায়- কন্যা সন্তান জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এক কালীন ৩ লক্ষ টাকার ফিক্সড ডিপোজিট দেওয়া হবে, যা বিয়ে না করে পড়াশোনা চালিয়ে গেলে ১৮ বছর বয়স হলে সুদ সমেত তুলতে পারবে।
ঘ- ধারায়- নারী নির্যাতন কারীর অপরাধ প্রমান হলে ৬ বছর পর্যন্ত জেল ও ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা হবে।
 [বিলটি মার্শাল সবাইকে দিয়ে আসেন। খামে ভরা থাকবে। খাম থেকে বের করে সকলে পড়বে।]

স্পীকারঃ মাননীয় বিরোধী দলনেতাকে এই বিল সম্পর্কে আলোচনার জন্য আপনাকে অনুরোধ জানাই।

বিরোধী দলনেতাঃ ধন্যবাদ মাননীয়/ মাননীয়া স্পীকার। মাননীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রী দ্বারা উত্থাপিত মেয়েদের স্বাস্থ্য ও অধিকার সংক্রান্ত– আলোশ্রী’ বিল, ২০১৯ কি আদৌ যুক্তি যুক্ত? পৃথিবীতে যে মহিলারা বাল্যবিবাহের শিকার হন তাদের এক তৃতীয়াংশ মহিলা ভারতের। ইউনিসেফ ও ভারত সরকারের যৌথ সমীক্ষার‍্যাপিড সার্ভে অন চিলড্রেন’ থেকে বাল্য বিবাহের ভয়াবহ চিত্র পাওয়া যায়। এই বিল কি করে সেই সমস্যার মোকাবিলা করবে? মেয়েদের স্বনির্ভরতার সঙ্গে বাল্যবিবাহের একটি সরাসরি সম্পর্ক আছে। সেক্ষেত্রে তার কোন উল্লেখই নেই এই বিলে।

স্পীকারঃ মাননীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রীকে তাঁর বক্তব্য রাখতে অনুরোধ করছি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীঃ বাল্যবিবাহ দূর করার জন্য এই বিলটি আনা হয়েছে। স্বনির্ভরতার সঙ্গে বাল্যবিবাহের সরাসরি কোন সম্পর্ক নেই। তাছাড়া নারীদের স্ব-নির্ভরতার জন্য রাজ্যে অন্য প্রকল্পও রয়েছে। কন্যা সন্তান ও তার বেড়ে ওঠার দিকেই লক্ষ্য রাখা হয়েছে এই বিলে।

বিরোধী দলের বিধায়কঃ এককালীন কণ্ডিশনাল ফিক্সড ডিপোজিটের কথা বলা হয়েছে। ২০১৩ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কন্যাশ্রী প্রকল্প চালু হয়। মাননীয়া স্পীকার, এত কিছু করেও বাল্যবিবাহ কমাতে পারা যাচ্ছে না যখন, তখন সরকার নতুন করে ফিক্সড ডিপোজিটের কথা বলে কেন বিল আনছেন?

মুখ্যমন্ত্রীঃ মাননীয়া স্পীকার, আমার বিরোধী দলের বন্ধুকে একটা পরিসংখ্যান দিতে চাই। বিরোধী দলনেতাকে জানাতে চাই, ‘ইউনিসেফ ও ভারত সরকারের যৌথ সমীক্ষার‍্যাপিড সার্ভে অন চিলড্রেন’ থেকে বাল্য বিবাহের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তাতে কন্যাশ্রী চালুর পর পশ্চিম বঙ্গে বাল্য বিবাহ ক্রমহ্রসমান। এই বিল চালু হলে আমরা বাল্য বিবাহকে শুন্যে নামিয়ে আনতে পারবো। এই প্রকল্পে তাই আমি বিরোধী দলের সহযোগিতা চাইছি।
[সরকার পক্ষের লোক টেবিল চাপড়ায়]

স্পীকারঃ মেয়েদের স্বাস্থ্য ও অধিকার সংক্রান্ত– ‘আলোশ্রী’ বিল, ২০১৯ সভায় আলোচিত হল। এখন মাননীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রীকে বিলটি বিবেচনার জন্য পেশ করতে অনুরোধ করছি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীঃ মাননীয়/ মাননীয়া স্পীকার, বিলটি যেভাবে সভায় স্থিরীকৃত হল তা গ্রহণ করা হোক।

স্পীকারঃ প্রশ্ন হল মেয়েদের স্বাস্থ্য ও অধিকার সংক্রান্ত– ‘আলোশ্রী’ বিল, ২০১৯ সভায় যেভাবে স্থিরীকৃত হল তা পাশ করা হোক।

যারা বিলের পক্ষে তাঁরা ‘হ্যাঁ’ বলুন।
[সরকার পক্ষের সকলে ‘হ্যাঁ’ বলে]
আর যারা বিলের বিপক্ষে তাঁরা ‘না’ বলুন।
[বিরোধী পক্ষের অধিকাংশ সদস্য ‘না’ বলে]

বিলটি সভায় গৃহীত হল। গৃহীত হল।
[সরকার পক্ষের সকলে টেবিল চাপড়ায়]
বিলটি রাষ্ট্রপতির নিকট সম্মতির জন্য প্রেরণ করা হল।
সভা আগামী ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ সকাল ১০ টা পর্যন্ত পর্যন্ত মুলতুবি রাখা হল।

স্পীকার খাতায় সই করেন। উঠে দাঁড়ান। মার্শাল দণ্ডটি নিয়ে আসেন।  সকলে ধীরে ধীরে সভাকক্ষ ত্যাগ করেন।

-----ধন্যবাদ-----

Thursday, 15 August 2019

History Of Panskura- স্বাধীনতা সংগ্রামে পাঁশকুড়া

স্বাধীনতার লড়াইয়ে পাঁশকুড়া- ২৮শের দুর্ধর্ষ রাত
@ রূ পে শ   কু মা র   সা ম ন্ত

     উড়িয়ে দেওয়া হল কালভার্ট, কেটে দেওয়া হল রাস্তা, উপড়ে ফেলা হল টেলিগ্রাফ পোস্ট, রাস্তার উপর শুইয়ে দেওয়া হল বড় বড় গাছ, ডুবিয়ে দেওয়া হল ফেরি নৌকা। স্তব্ধ হয়ে গেল তমলুক-পাঁশকুড়া বাস রাস্তা। আর এই পুরো ঘটনাটি ঘটল মাত্র ৬ ঘন্টায়। ঘড়ির কাঁটায় রাত্রি ১০টা থেকে ভোর ৪টার মধ্যে। সাল ১৯৪২, তারিখ ২৮শে সেপ্টেম্বর।
     ভারতবর্ষ জুড়ে চলছে আগস্ট আন্দোলন। স্বাধীনতার যুদ্ধ। আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়লো তমলুক মহকুমায়। ১৯৪২ এর ২৯শে সেপ্টেম্বর তমলুক থানা আক্রমন করলেন বীর সংগ্রামীরা। ব্রিটিশ বর্বর পুলিশের গুলিতে অন্যতম শহীদ হলেন মাতঙ্গিনী হাজরা। তমলুকে শহীদ হলেন মোট ১৩ জন। গুরুতর আহত হলেন ২০ জন। সেই রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের রেশ ধরেই ১৯৪২ এর ১৭ই ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার’। কিন্তু এই আন্দোলনে উপেক্ষিতই থেকে গেছে পাঁশকুড়ার অবদান। ২৯শে সেপ্টেম্বরের তমলুক থানা আক্রমনের ঘটনাকে সফল করতে তার আগের রাত ২৮শে সেপ্টেম্বরে তমলুককে ব্রিটিশ প্রসাশন থেকে বিচ্ছিন্ন করতে অত্যন্ত গূরুত্বপূর্ণ একটি কাজ সংগঠিত হয়ে ছিল পাঁশকুড়ায়। [লেখক- রূপেশ সামন্ত]
     তমলুক মহকুমার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাকা রাস্তা ছিল পাঁশকুড়ায়। তাই তমলুক থানা আক্রমনকে মসৃণ করতে তমলুক-পাঁশকুড়া বাস রাস্তা বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া জরুরী হয়ে পড়ে। যাতে না ব্রিটিশ ফৌজ তমলুকে দ্রুত প্রবেশ করতে পারে। অত্যন্ত গোপনে তৈরী হল নিখুঁত পরিকল্পনা। স্বাধীনতা সংগ্রামী সতীশ সামন্ত ও অজয় মুখার্জী পাঁশকুড়ার জোড়াপুকুরে শ্যামাদাস ভট্টাচার্যের বাড়িতে বসে কাজের রূপরেখা ছকে ফেলেন।
     সে এক দুর্ধর্ষ রাত। গোপনে খবর পৌঁছে গেল সংগ্রামীদের কাছে। ব্রিটিশ চরদের চোখ এড়িয়ে সাইকেলে বা পায়ে হেঁটে খবরাখবরের মাধ্যমে পুরো পরিকল্পনা স্থির হয়ে গেল। ২৮শে সেপ্টেম্বর রাত ১০টা। কোদাল, গাঁইতি, কাটারি, কুড়ুল, করা্ত, ঝুড়ি, বেলচা, দড়ি ইত্যাদি হাতে দলে দলে মানুষ জড়ো হয়ে গেল তমলুক-পাঁশকুড়া বাস রাস্তায়। ঘড়ির কাঁটা ধরে শুরু হল অপারেশন। ২০-৩০ হাত করে রাস্তা কাটা হল। সমস্ত টেলিগ্রাফ পোস্ট উপড়ে ফেলা হল। হলদি ও কাঁসাই নদীর গভীরে ডুবিয়ে দেওয়া হল সব ফেরি নৌকা। কালভার্ট গুলোকে ভেঙে দেওয়া হল। রাস্তার ধারের সমস্ত বড় বড় গাছ কেটে ঘিরে দেওয়া হল রাস্তা। লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থা। ঘড়ির কাঁটায় ভোর ৪টার মধ্যে সমস্ত কাজ শেষ করে প্রত্যেকে বাড়ি ফিরে গেল। বৃহত্তর তমলুক মুক্তাঞ্চলে পরিনত হল। [লেখক- রূপেশ সামন্ত]
     কিন্তু ব্রিটিশ পুলিশ খবর পেয়ে এলাকাবাসীর উপর নির্মম অত্যাচার নামিয়ে আনে। বলপুর্বক এলাকাবাসীকে রাস্তা সারাইয়ে অংশ গ্রহন করায়। তমলুক থানা আক্রমনের নির্ধারিত সময় ছিল দুপুর ২টা। তার মাত্র কিছু সময় আগে পুলিশ তমলুকে পৌঁছাতে সক্ষম হয় এবং গুলি চালনার মতো নারকীয় অপরাধ সংগঠিত করে।
     কিন্তু সেই দুর্ধর্ষ রাতের পাঁশকুড়ার বীর বিপ্লবীদের পরিচয় আজও রহস্যাবৃত। ইতিহাসে লেখা নেই নাম। এটা নিশ্চিত যে, এত বড় পরিকল্পনাকে সফল করতে ও ব্রিটিশ পুলিশ থেকে নিজেদের গোপন রাখতে সেই দুর্ধর্ষ বীরদের পরিচয় অত্যন্ত গোপন রাখা হয়েছিল। আর ভারতবর্ষকে স্বাধীন করতে কত অজানা মানুষ সাথ দিয়েছিল, তার খবর আমরা কতটুকুই বা রেখেছি! আজও পাঁশকুড়ার গ্রামে কান পাতলে তাদের কথা শোনা যায়। কেউ স্বাধীনতা সংগ্রামীর পেনশন পেয়েছে, কেউ পায়নি বা কেউ নেননি। স্যালুট জানাই সে দুর্ধর্ষ রাতের দুর্ধর্ষ বীরদের।  [ছবি- প্রতিকী]
@ রূ পে শ   কু মা র   সা ম ন্ত

Saturday, 13 April 2019

বাংলার চৈত্র মাসঃ বাঙালীর গাজন মাস

------- ----- ---বাংলার চৈত্রমাসঃ বাঙালীর গাজন মাস--- ----- -------
     নীল পুজোর দিন গ্রামবাংলার মহিলারা কেন নীলব্রত পালন করেন? গাজনের সন্ন্যাসীরা কেনই বা জিভে লোহার শিক গেঁথে, ভাঙা কাচের টুকরোর ওপর হেঁটে, আগুনে বা বঁটির উপর ঝাঁপ দিয়ে শারীরিক কষ্ট স্বীকার করে?  কেনইবা চড়ক গাছ থেকে পিঠে বঁড়শি গেঁথে দড়ি দিয়ে মানুষকে ঝুলিয়ে উৎসব পালন হয়? অনেক কৌতুহল। লোক-সংস্কৃতির ইতিহাসে একটু উঁকি-ঝুঁকি দিলেই কারণ গুলো জানা যায়। আসলে, গাজন একটি হিন্দু লোকউৎসব। কিন্তু গাজন উৎসব কে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত গাজন মেলায় সর্ব-ধর্মের মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠান এক সার্বজনীন রূপ নেয়। চৈত্র মাসের শেষ সপ্তাহ জুড়ে শিবের গাজন অনুষ্ঠিত হয়। ছড়া গানের মধ্যেও রয়েছে শিবের গাজন- ‘আমরা দুটি ভাই শিবের গাজন গাই।/ ঠাকমা গেছেন গয়া কাশী ডুগডুগি বাজাই।’ গাজন উৎসবের মূলত তিনটি অংশ— ঘাট-সন্ন্যাস, নীলব্রত ও চড়ক।
-----ঘাট-সন্ন্যাস-----
     অতীতে চৈত্রের প্রথম দিন থেকেই ভক্তরা সন্ন্যাস পালন করতেন। বর্তমানে চৈত্র সংক্রান্তির সাত দিন আগে, কোথাও বা তিন দিন আগে থেকে কঠোর নিয়ম নিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ঘাট-সন্ন্যাস পালন করা হয়। ঐ ক’দিনের সন্ন্যাস পালন অত্যন্ত কঠিন। গেরুয়া বস্ত্র ধারণ করতে হয়। ব্রতধারী সন্ন্যসীদের হবিষ্যি গ্রহণ করতে হয়। এক জন প্রধান সন্ন্যাসী থাকেন। এখন অনেক মহিলারাও সন্ন্যাসিনী হন। যাইহোক, বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে গাজন উৎসব এর আঞ্চলিক বৈচিত্র বেশ লক্ষ্যনীয়। সন্ন্যাসীদের মুখোশ নৃত্য আর সঙ সাজা একটি অন্যতম দিক। সন্ন্যাসীরা শিব ও গৌরী সেজে এবং অন্যান্যরা নন্দী, ভৃঙ্গী, ভূতপ্রেত, দৈত্যদানব প্রভৃতির সঙ সেজে নৃত্য করতে থাকেন। নানা লৌকিক ছড়া আবৃত্তি ও গান করতে থাকেন। ব্রতধারী সন্ন্যসীরা শিবের পুজোর ফুল গ্রহণ করে প্রতীকী শিবলিঙ্গ নিয়ে ঢাক, ঢোল, কাঁসর, বাজনা বাজিয়ে গ্রাম পরিক্রমায় বের হন। মুখোশ নৃত্যে ফুটে ওঠে পৌরানিক গল্পের নানা চরিত্র, দেব-দেবী, রাক্ষস, পশু ইত্যাদি। গাজনের সন্ন্যাসীরা নিজেদের শরীরকে বিভিন্ন উপায়ে যন্ত্রনা দিয়ে কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে ইষ্ট দেবতাকে সন্তোষ প্রদানের চেষ্টা করেন। এ ছাড়াও হয় কালীনাচ। কালী সেজে, মুখোশ পরে নাচকে বলা হয় কালীনাচ। গাজন সাধারণত তিনদিন ধরে হয়। এই উৎসবের সঙ্গে মেলা অপরিহার্য।
-----নীল পূজা-----
     নীল পূজা পালিত হয় গাজনের পরের দিন তথা চড়কের আগের দিন। বাঙালি গৃহিণীরা নিজের সন্তান এর মঙ্গল কামনায় নীরোগ সুস্থ জীবন কামনা করে নীলষষ্ঠীর ব্রত পালন করে চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন। জনশ্রুতি অনুসারে, এক বামনী অতি ভক্তি সহকরে সমস্ত ব্রত করতেন। কিন্তু তাঁর একটিও ছেলে মেয়ে বাঁচতো না। তারপর মনের দুঃখে সব ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে কাশী চলে যান। একদিন কাশীতে যখন ঘাটের ওপর বসে মনের দুঃখে কাঁদছিলেন, তখন মা ষষ্ঠী বুড়ি বামনীর বেশ ধরে এসে তাদের জিজ্ঞেস করেন, “কাঁদছিস কেন?” বামনী বললে, “আমার পাঁচটি ছেলে আর একটি মেয়ে ছিল, কিন্তু সব ক’টাই মরে গেল। সব বার–ব্রত, ঠাকুর দেবতা মিথ্যে।” মা ষষ্ঠী জিজ্ঞাসা করলেন, “তোরা কি নীল ষষ্ঠী করেছিস?” বামনী বললে, “ও ব্রত তো আমি জানি না।” তখন মা ষষ্ঠী বললেন, “সমস্ত চৈত্র মাস সন্ন্যাস করে শিব পুজো করবে, তারপর সংক্রান্তির আগের দিন উপোষ করে সন্ধ্যার সময় নীলকণ্ঠ শিবের ঘরে বাতি জ্বেলে দিয়ে, মা ষষ্ঠীকে প্রণাম করে তবে জল খাবে।” এই কথা বলে মা ষষ্ঠী অদৃশ্য হয়ে গেলেন। তারপর বামনী দেশে ফিরে গিয়ে খুব ভাল করে নীল ষষ্ঠীর পুজো করল। এরপর তাদের যতগুলো ছেলেমেয়ে হল, সবাই বেঁচে রইল। ব্রত-আচার অনুযায়ী, গৃহিনীরা সারাদিন উপোষ করে সন্ধ্যায় শিবের মাথায় পাঁচটি আকন্দ ফুল, সিদ্ধি, গাঁজা, দুধ মিশ্রিত গঙ্গাজল ঢেলে ঘীয়ের প্রদীপ জ্বেলে শিবকে প্রনাম করে জল খায়। এ দিন গাজনের সন্ন্যাসীদের ফল, আতপ চাল, অর্থ দান করা হয়। রাতে নীল পূজার পর সন্ন্যাসীরা উপোষ থাকেন। পরদিন বিকেলে চড়ক পূজা শেষেই উপোষ ভাঙেন তারা।
-----চড়ক পূজা-----
      চৈত্র মাসের শেষ দিনে উদ্‌যাপিত হয় চড়ক উৎসব। সারা বছর ধরে চড়ক গাছকে শিবমন্দিরের কাছের কোনও পুকুরে ডুবিয়ে রাখা হয়। সেই পুকুর ‘শিবপুকুর’ নামে পরিচিত। চড়কের দিন গাছটিকে তুলে আনা হয় মন্দিরের সামনে। তার পর, চড়কগাছ পুজো করে তা মাঠের মাঝে পোঁতা হয়। এর পরে শুরু হয় চড়ক অনুষ্ঠান। সঙ্গে চলে বিরাট মেলা। চড়ক গাছ থেকে পিঠে বঁড়শি গেঁথে দড়ি দিয়ে সন্ন্যাসীকে ঝুলিয়ে দিয়ে ক্রমাগত ঘুরপাক খাওয়ানো হয়। ঘুরপাক খেতে খেতে সেই সন্ন্যাসী নীচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের উদ্দেশে ছুড়ে দেন বাতাসা, ফল ইত্যাদি। সন্ন্যাসীর আর্শীবাদ লাভের আশায় শিশু সন্তানদেরও শূন্যে তুলে দেওয়া হয়। সন্ন্যাসীরা ঘুরতে ঘুরতে শিশুদের মাথায় হাত দিয়ে আর্শীবাদ করেন। সন্ন্যাসীদের বিশ্বাস, জগতে যারা শিব ঠাকুরের কৃপা লাভের জন্য স্বেচ্ছায় এত কঠিন আরাধনার পথ বেছে নিয়েছে, বিনিময়ে পরলোকে শিবঠাকুর তাদের স্বর্গে যাওয়ার বর দেবেন।
-----গাজনের ইতিহাস-----
১. গবেষকদের মতে, ‘গাজন’ শব্দটি ‘গর্জন’ শব্দ থেকে ব্যুৎপন্ন হয়েছে। এই উৎসবে অংশগ্রহণকারী সন্ন্যাসীরা প্রচণ্ড গর্জন করেন বলে উৎসবের নাম গাজন। অন্য গবেষকদের মতে, ‘গা’ শব্দের অর্থ ‘গ্রাম’ এবং ‘জন’ শব্দের অর্থ ‘জনগন’। গ্রামীণ জনগনের উৎসব হওয়ায় এই উৎসবের নাম গাজন।
২. বিশ্বাস মতে, গাজন উৎসবের সময় দেবী হরকালীর সঙ্গে শিবের বিবাহ হয়। সন্ন্যাসীরা ঐ উৎসবে বরযাত্রী হিসেবে অংশ নেন।
৩. গাজন নিয়ে ভারতকোষকার বলেছেন, “… প্রকৃতপক্ষে এই উৎসবের লক্ষ্য সূর্য এবং তাহার পত্নী বলিয়া কল্পিত পৃথিবী। সূর্যের সঙ্গে পৃথিবীর বিবাহ দেওয়াই এই অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য। চৈত্র মাস হইতে বর্ষার প্রারম্ভ পর্যন্ত সূর্য যখন প্রচণ্ড অগ্নিময় রূপ ধারণ করে তখন সূর্যের তেজ প্রশমন ও সুবৃষ্টির আশায় কৃষিজীবী সমাজ এই অনুষ্ঠানের উদ্ভাবন করিয়াছিল। গ্রাম্য শিব মন্দিরকে কেন্দ্র করিয়া এই উৎসবের অনুষ্ঠান হয়।”
৪. আবার অন্যমতে, নিজেদের কে যন্ত্রণা দিয়ে আমরা অনুভব করার চেষ্টা করি যে, এই পৃথিবীটা কুসুমাস্তীর্ণ নয়। সুখের সঙ্গে দুঃখকে গ্রহণ করতে পারলে জীবন সংগ্রামে জয়ী হওয়া যায়। তাই হয়তো শরীর কে যন্ত্রনা দিয়ে এই উৎসব পালন করার রেওয়াজ তৈরী হয়েছে।
৫. গাজন সূত্রপাতের দিনক্ষন বলা মুশকিল। বৌদ্ধধর্মের প্রভাব যখন কমে এসেছিল, তখন কিছু বৌদ্ধ সন্ন্যাসী হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। ফলে হিন্দু ধর্মের সাথে কিছু বৌদ্ধ তন্ত্র মন্ত্রের মিশ্রন হয়। এই তান্ত্রিক ক্রিয়া থেকেই সৃষ্টি হয় চড়ক পুজোর। সন্ন্যাসীরা তান্ত্রিক সাধনা অভ্যাসের ফলে নিজেদের শারীরিক কষ্টবোধের ঊর্ধ্বে উঠে যান। পিঠে বঁড়শি গাঁথা, দড়ি দিয়ে আগুনে উপর ঝুলিয়ে দেওয়া, জিভে বা শরীরের কোনও জায়গায় লোহার শিক গেঁথে দেওয়া বা ভাঙা কাচের টুকরোর ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া ইত্যাদি কষ্ট স্বীকার তারই অঙ্গ।
৬. গাজন সূত্রপাতের দিনক্ষন নিয়ে লোককথায় শোনা যায় নানা কাহিনি। শোনা যায়, বান রাজা শিবকে তুষ্ট করতে কৃচ্ছ্বসাধনের মধ্য দিয়ে তপস্যা করেছিলেন। শিবভক্তির সেই সূত্র ধরেই চড়কের সন্ন্যাসীরা আজও বান ফোঁড়ান, নানা ধরনের ঝাঁপ দেন। আগুনঝাঁপ, কাঁটাঝাঁপ, বঁটিঝাঁপ, ঝুলঝাঁপ ইত্যাদি তারই অঙ্গ। বাংলার কোনও কোনও অঞ্চলে গাজনে নরমুণ্ড নিয়ে নৃত্যের প্রচলন আছে।
৭. যদিও প্রথমে গাজন উৎসব নিম্নবর্গের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, পরবর্তীতে ১৪৮৫ সালে উচ্চ স্তরের লোকদের মধ্যে এ অনুষ্ঠানের প্রচলন শুরু করেন সুন্দরানন্দ ঠাকুর নামের এক রাজা। এ পূজার অপর নাম নীল পূজা। গম্ভীরাপূজা বা শিবের গাজন এই চড়কপূজারই রকমফের।
৮. ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার আইন করে গাজনের নামে ‘শারিরীক নির্যাতন’ প্রথা বন্ধ করলেও গ্রামের সাধারণ লোকের মধ্যে এখনো তা প্রচলিত আছে।
[পৌরানিক কাহিনী ভিত্তিক রচনা/ লেখক- রূপেশ সামন্ত/ ০৫.০৪.২০১৮]

Monday, 1 April 2019

ছোট গল্প- শ্লেট


শ্লেট

[প্রকাশিত- নীল আকাশের খাতা]

 লেখক- রূপেশ কুমার সামন্ত


          'চা এর এই গরম জলই আজ গায়ে ঢালব! একবার ঘুম থেকে উঠুক! ছেলেটা কি আমার একার নাকি! আজ আমি আর গার্ডিয়ান মিটিংয়ে যাচ্ছি না!' স্বগতোক্তি করতে করতে রাগে টগবগ করে ফুটছিল দিদিমনি। সকাল বেলায় গ্যাস ওভেনে চা'য়ের জন্য জলটাও ফুটছিল টগবগ করে। দিদিমনির নাম মেঘা রায়। স্বামীও শিক্ষক। নাম সুতনু রায়। শিক্ষক দম্পতি শহরের একটি ফ্ল্যাটে থাকেন। তাদের একটি ছয় বছরের ছেলেও রয়েছে। সে বিগত দু'বছর ধরে স্কুলে যাচ্ছে। সে একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ক্লাস ওয়ানে পড়েগতকাল রেজাল্ট আউট হয়েছে। আজ অভিভাবক সাক্ষাতে ছাত্রদের খাতা দেখানো হবে।
         রান্নাঘরের পাশের রুমে তখনও শুয়ে আছে সুতনু। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবলেন, আজ আর চা খাওয়া হল না!
         চুপি চুপি উঠলেন সুতনু বাবু। মনে মনে ভাবলেন, গৃহশান্তি আগে! প্রাপ্য ছুটির বলিদান দেওয়াই ভালো! লুকিয়ে ফোন করলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষককে। ছুটিটা অনেক কষ্টে ম্যানেজ করলেন।
          সুতনু বাবু স্ত্রীকে ধীরে ধীরে বললেন, ‘মেঘা, আজ আমি অম্বরের স্কুলের গার্ডিয়ান মিটিংয়ে যাবোদিদিমনি তো আকাশ থেকে পড়লেন। ব্যাপারটা গোলমেলে ঠেকলো। রাগ এতো সহজে কমার নয়! রণমূর্তি ধারণ করে বলল, ‘আমি কি একাই ওর পড়ানোর জমিদারি নিয়ে রেখেছি। বাবার তো কোন দায় দায়িত্ব নেই! পাশের ফ্ল্যাটের ইশিতাদির মেয়ে রিকা এবারেও ফার্স্ট হয়েছে। তার বাবা-মা দুজনে মিলে পড়ায়। তাহলে আমার ছেলের রোল দশ হবে না তো কি এক হবে!’
          এতক্ষণে সুতনু বুঝতে পারল দিদিমনির রাগের কারনটা। সংসারের শান্তি রক্ষায় সুতনু চুপ থাকাই শ্রেয় মনে করলরেডি হয়ে সুতনু ছেলেকে নিয়ে স্কুলের দিকে রওয়ানা হল।
          স্কুলের একটি হল ঘরের মধ্যে সভা শুরু হল। সেখানে ছাত্র-ছাত্রী, অভিভাবক-অভিভাবিকা ও শিক্ষক-শিক্ষিকারা উপস্থিত। প্রধান শিক্ষিকার দীর্ঘ উপদেশ বানী কিছুক্ষণ চলল।
          এরপর ডাক পড়ল রিকা রায়ের। সঙ্গে মা ইশিতা রায়। প্রধান শিক্ষিকা বললেন, ‘আপনার মেয়ে ক্লাসে ফার্স্ট হলেও রেজাল্ট ভালো হয়নি। অন্য সাবজেক্ট গুলোতে ফুল মার্কস পেলেও ইংলিশে পঁচিশের চব্বিশ পেয়েছে। এক কম পেয়েছে। ওকে একটু চাপ দিন। প্র্যাকটিসটা বেশি করে করান। এতো কম পড়াশোনা করলে হবে না
          ইশিতা দেবী রিকার পিঠে ঠাস ঠাস করে মারতে লাগলেনকেন এক নম্বর কম পেলি বল। তোর আজ খাওয়াই বন্ধইশিতা দেবী রাগত ভাবে বলে চললেন।
          সুতনু চুপ থাকতে পারলেন না। ইশিতা দেবীকে থামিয়ে বললেন, ‘ওকে এভাবে মারবেন না। ও তো শিশু! পরীক্ষাটাই কি জিনিস ও তো বোঝে না! তাছাড়া এখানে ওর বন্ধুরাও রয়েছে। দেখুন, বেচারীর কেমন লজ্জায় ভয়ে মুখটা লাল হয়ে গেছে!’
          ইশিতা দেবী এবার খানিকটা উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। তিনি বললেন, 'দেখুন সুতনু বাবু, এই সময়টাই ওকে মানুষ করার বয়স। খেলাধুলার জন্য সারা জীবন পড়ে আছে'বৃথা বাক্যব্যয় ভেবে সুতনু বাবু চুপ করে গেলেন।
          এরপর ইশিতা দেবী ব্যাগ থেকে একটা শ্লেট বের করলেন। সেটি প্রধান শিক্ষিকাকে দেখিয়ে বললেন, 'বাড়িতে ওকে এতো প্র‍্যাক্টিস করাই যে, খাতার যোগান দিতে হিমশিম খাচ্ছিলাম। তাই শেষে একটা শ্লেট কিনলাম। দেখুন, ওকে এত প্র‍্যাক্টিস করিয়েছি যে শ্লেটটা কেমন অস্পষ্ট হয়ে গেছে! আর কি করলে হবে বলুন তো?'
          প্রধান শিক্ষিকা বললেন, 'বা! দারুন আইডিয়া! ওকে শ্লেটেই আরো বেশি করে প্র‍্যাক্টিস করান'
          এরপর আরো কিছু অভিভাকের সঙ্গে কথা বলার পর এলো সুতনু বাবুর পালা। প্রধান শিক্ষিকা বললেন, 'আপনার ছেলের তো পজিশন দশ হয়েছে। ওর প্রতিটা বিষয়ে তিন চার নম্বর করে কম আছে। বাড়িতে বেশি করে প্র‍্যাক্টিস করান। পড়াশোনায় একটু চাপ দিন'
          সুতনু বাবু বিনীতভাবে বললেন, 'ম্যাম, কি চাপ দিই বলুন তো! ঐটুকু ছেলের ঐ ছোট্ট দেহটা কি চাপ সইতে পারবে? ওর মনটাও তো এখনও ততটা বড় হয় নি, যে এতটা চাপ নিতে পারবে!'
          প্রধান শিক্ষিকা বলে উঠলেন, 'ছেলেকে মানুষ করতে চাইলে পড়াশোনার চাপ তো দিতেই হবে'
           'হুম, মানুষ করতেই তো চাই। কিন্তু চাপ নেওয়ার মতো শরীর আর মনটা তৈরি হোক। সারা জীবন তো ওকে চাপ বইতে হবে! ওকেই ওর লড়াই লড়তে হবে! এখন ওর শৈশবটা একটু উপভোগ করুক না! মন আর শরীরের বিকাশ হয়ে গেলে দেখবেন দু'বছরের পড়া দু'মাসেই শিখে ফেলেছেওর শ্লেটটা এখন খালিই থাক! পরে প্র‍্যাক্টিসের জন্য জায়গা তো রাখতে হবে!' গড়গড়িয়ে বলে গেলেন সুতনু বাবু।
          বেগতিক বুঝে প্রধান শিক্ষিকা আর কথা বাড়ালেন না। দ্রুত সভা শেষ করে দিলেন।
          সুতনু বাবু বাড়ি ফিরতে ফিরতে ছেলে অম্বরকে বলল, 'কিরে পরীক্ষায় তো ভালই রেজাল্ট করলি। যাবি নাকি রেষ্টুরেন্টে?'
          'কিন্তু মা তো রেগে আছে। রিকা ফার্স্ট হয়েছে। আমি হতে পারিনি। মাকে আমার ভয় লাগে। আমার পড়তেই ইচ্ছে করছে না আর!' অম্বর তার বাবাকে বলল।
           'দুর বোকা ছেলে! মাকে জড়িয়ে ধরে একটা হামি খেয়ে নিবি। দেখবি মায়ের সব রাগ চলে যাবে! আর রিকা ফার্স্ট হয়েছে তো কি হয়েছে! তুই কারো সাথে তুলনা করিস না! তুই তোর মতো করে খুব ভালো রেজাল্ট করেছিস'সুতনু ছেলেকে বলল।
           'তুমি আমার খুব খুব ভালো বাবা! আমি তো ভালো রেজাল্ট করেছি! তাহলে আমায় একটা গিফট দেবে?' অম্বর বলল।
          'কি বল?' সুতনু বলল।
          'আমায় আজ মাঠে খেলতে নিয়ে যাবে? আমার রিকার সঙ্গে খেলতে খুব ইচ্ছে করে। রিকাও খেলতে চায়। ওর মা ওকে খেলতে দেয় না'
          চোখটা ছলছল করে উঠল সুতনুর। সে বলল, 'হ্যাঁ, তুই রোজ খেলতে যাবি। খেলবি বেশি করে, আর ইচ্ছে হলে পড়বি' তারা রেস্টুরেন্টে গেল। খাবারের চারটি পার্সেল নিল। অম্বর বলল, 'বাবা, আমরা তো তিনজন! চারটে পার্সেল কি হবে?''
         সুতনু বলল, 'তোর বন্ধু রিকাকে তার মা আজ খেতে দেবে না বলেছে। ওকে একটা পার্সেল লুকিয়ে দিয়ে আসবি' অম্বর খুব খুশি হল। নাচতে নাচতে বাড়ি ফিরল।
        পরের বছর ক্লাস টু’য়ের রেজাল্ট বের হল। রিকা ক্লাসে থার্ড হল। আর অম্বরের পজিশন এইট। অভিভাবক সভায় সুতনু বাবু উপস্থিত হল। সভায় রিকার মা যথারীতি রিকার পিঠে বেশ কয়েক ঘা দিল। শাস্তিও ঘোষণা করল রিকার দু'দিন খাওয়া বন্ধ। সেই সঙ্গে শ্লেটটাও দেখাতে ভূললেন না! পার্থক্যটা চোখে দেখা গেল। লিখতে লিখতে শ্লেটটা আগের চেয়ে অনেক অস্পষ্ট হয়ে গেছে।
          বাড়ি ফেরার পথে সুতনু বাবু ছেলেকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে ঢুকল। এবারে পাঁচটা পার্সেল নিল। অম্বরের কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই সুতনু বললেন, ‘তিনটে পার্সেল আমাদের জন্য। রিকার দুদিন খাওয়া বন্ধ। ওকে দুটো পার্সেল লুকিয়ে দিস। একটা ড্রাই ফুড আছে’। এবার অম্বর বলল, ‘আর আমার গিফট?’
          সুতনু বলল, ‘আজকে তোর সঙ্গে ডাবল টাইম খেলব এটাই তোর গিফট’।
         ‘আই লাভ ইউ বাবা!’ বলেই অম্বর বাবার গলাটা জড়িয়ে ধরল। সুতনু বাবুর চোখের জল এসে গেল।
         কিন্তু মেঘা দিদিমনি ছেলেকে নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন। ছেলের প্রতি বাবার ‘উদাসীনতা’ তাকে যেন আরও রুষ্ট করে তুলেছে। সংসারের শান্তি রক্ষায় সুতনু বাবু বড্ড চুপচাপ হয়ে গেছেন। শুধু অদৃশ্য ভাবে রক্ষা করে চলেন ছেলে অম্বরকে
        এই ভাবেই দু’বছর কেটে গেল। ক্লাস ফোরের রেজাল্ট আউট হয়েছে। এবার রিকা ক্লাসে টেন পজিশন পেয়েছে। আর অম্বর ক্লাসে ফার্স্ট। অভিভাবক সভায় সবাই হাজির। প্রধান শিক্ষিকার দীর্ঘ ভাষণ দিয়ে শুরু হল সভা।
        সভার শুরুতেই ইশিতা দেবী উদভ্রান্তের মতো ব্যাগ থেকে শ্লেটটা বেরঙ্করতে করতে বললেন, ‘কেন এমন হল বলতে পারেন? যে মেয়েটা ফার্স্ট হত, সে আজ পিছতে পিছতে দশ! এরপর তো ফেল করবে! এই দেখুন শ্লেটটা। এতো প্র্যাক্টিস করিয়েছি যে, শ্লেটটা আর স্পষ্ট দেখাও যায় না।  কালো শ্লেট সাদা হয়ে গেছে! আর কত প্র্যাক্টিস করাবো?’
         সুতনু বাবু নিস্পাপ মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ছিল। মানুষ হতে গিয়ে রিকার অবস্থাটা দেখে চোখটা ছলছল করে উঠল সুতনুর। এরপর তিনি দাঁড়িয়ে উঠে শুধু বললেন, ‘শ্লেটটা তো শৈশবেই ভরিয়ে ফেলেছেন। একটুও খালি রাখেন নি! প্র্যাক্টিস করবে কোথায়?’

০৫.০৮.১৮

বাংলাদেশের ভারত বিরোধিতা: আবেগ না রাষ্ট্রবুদ্ধি?

বাংলাদেশের ভারত বিরোধিতা: আবেগ না রাষ্ট্রবুদ্ধি? ✍️ রূপেশ কুমার সামন্ত  বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে সাম্প্রতিক কালে ভা...