Thursday, 5 December 2024

কোন পথে বাংলাদেশ? ধর্ম, ভাষা, নাকি বিজ্ঞান?

এ কোন পথে বাংলাদেশ?
ধর্ম, ভাষা, নাকি বিজ্ঞান?

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান (যার মধ্যে ছিল বাংলাদেশও) স্বাধীন রাস্ট্র হয়েছিল ধর্মের দাবীতে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন রাস্ট্র হল ভাষার (বাংলা ভাষা) দাবীতে। সেই স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিল ভারত। 

পরাজিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল নিয়াজি ঢাকার রমনা রেসকোর্সে ৯৩,০০০ সেনাদল সঙ্গে নিয়ে জেনারেল জগজিৎ সিং আরোরার নেতৃত্বাধীন ভারতীয় সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। বিজয় সুচিত হয়েছিল '৭১ এর ১৬ই ডিসেম্বর। ভারত এই দিনটি "বিজয় দিবস" রূপে আজও পালন করে। ভারতই বাংলাদেশকে প্রথম স্বাধীন ও সার্বভৌম রাস্ট্রের স্বীকৃতি দিয়েছিল।

ধর্ম নিরেপক্ষ ভারত রাস্ট্র আজ বিজ্ঞানে মহাকাশ বিজয় করে চাঁদে মিশন করছে। অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রেও ভারত আজ শক্তিধর রাস্ট্র। আর সেই পাকিস্তান আজ দেউলিয়ার পথে। অন্যদিকে ভাষার ভিত্তিতে মুক্তি যোদ্ধাদের বাংলাদেশ রাস্ট্র গড়ার মুল স্পিরিটটাই আজ ভূলুণ্ঠিত। উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার পথ থেকেও দেশটি আজ বিচ্যুতির পথে। এখন বাংলাদেশ বাসীকেই ঠিক করতে হবে, ভারতের মতো বন্ধু দেশের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভাষার পরে বিজ্ঞানের পথে পাড়ি দেবে, নাকি তলিয়ে যাওয়া দেশ পাকিস্তানের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ধর্মান্ধতার অন্ধগলি পথে পাড়ি দেবে! শেষ কথা একটাই-

ধর্ম থাকুক যে যার,
দেশটা হোক সবার।
দেশ গড়তে
দাবি একটাই,
ধর্ম নয়
বিজ্ঞান চাই।

© রূপেশ কুমার সামন্ত 

Wednesday, 27 November 2024

ধর্মমঙ্গল কাব্যের কিংবদন্তী লাউসেনের ময়নাগড়ের দুর্ভেদ্য পরীখা

 ময়নাগড়ের দুর্ভেদ্য পরীখা

রূপেশ কুমার সামন্ত

আনুমানিক দশম শতাব্দীর ধর্মঙ্গল মহাকাব্যের লাউসেনের কিংবদন্তী রাজধানী হল ময়নাগড়। গৌড়েশ্বর ধর্মপালের রাজত্বকালে কর্ণসেন তাঁর অধীনে রাজত্ব করতেন। ইছাই ঘোষের সঙ্গে যুদ্ধে কর্ণসেন তাঁর ছয় পুত্রকে হারান। তাঁর স্ত্রী বিষপানে দেহত্যাগ করেন। তখন গৌড়েশ্বর ধর্মপাল নিজের শ্যালিকা রঞ্জাবতীর সঙ্গে কর্ণসেনের বিয়ে দেন। কর্ণসেনকে দক্ষিণবঙ্গের একটি বিশেষ অঞ্চল দান করেন। এটি কর্ণগড় নামে খ্যাত। এই কর্ণগড়ই পরে ময়নাগড় নামে প্রসিদ্ধ হয়। এই রঞ্জাবতীর ছেলে ছিল লাউসেন। এই লাউসেনের কিংবদন্তী রাজধানী হল ময়নাগড়। পরবর্তী কালে  বাহুবলীন্দ্র রাজারা বালিসীতাগড় থেকে নিজেদের রাজধানী ময়নাগড়ে স্থানান্তরিত করেন। কালিদহ ও মাকড়দহ নামে দুটি পরীখা দিয়ে ঘেরা এই ছোট্ট দ্বীপ ময়নাগড়। দ্বীপটি ছিল দুর্ভেদ্য দুর্গ। চারিদিকে ঘেরা ছিল পার্বত্য গুলিবাঁশের ঝাড়ের দুর্ভেদ্য প্রাকৃতিক প্রাচীর।

মঞ্জুশ্রী বাহুবলীন্দ্রের 'চিকের আড়ালে' প্রবন্ধ থেকে জানা যায়, পূর্বে পরীখা দুটি কচুরীপানা ও পদ্মতে পরিপূর্ণ ছিল। কচুরিপানা এত ঘন ছিল যে তার উপর দিয়ে মানুষ বা জন্তু জানোয়ারের চলাফেরা করতে অসুবিধে হত না। পদ্মের ডাটায় জড়িয়ে থাকত সর্পকুল। আর দুই পরীখার মাঝের ঘন জঙ্গলে বিচরণ করত হরিণ, ময়ূর, ছোট বাঘ, বিষধর সাপ।  জলে ভেসে বেড়াত কুমির। একবার জনৈকা দাসী শীতকালে কাজের অবসরে চুল মেলে কালিদহের ধারে ঘুমিয়ে পড়লে সেই অসতর্ক মুহুর্তে কুমির তাকে গভীর জলে টেনে নিয়ে যায়।  গড়ে বসবাসরত প্রতিটি পরিবার এর নিজস্ব নৌকা রাখা ও নৌকা চালানো শেখা বাধ্যতামূলক। 

তথ্যসূত্র

কিল্লা ময়নাচৌরা

সম্পাদনা ড. কৌশিক বাহুবলীন্দ্র

ধর্মমঙ্গল কাব্যের কিংবদন্তী লাউসেনের ময়নাগড়ের বাঁশঝাড়ের দুর্ভেদ্য প্রাকৃতিক প্রাচীর

 ময়নাগড়ের বাঁশঝাড়ের দুর্ভেদ্য প্রাকৃতিক প্রাচীর 

রূপেশ কুমার সামন্ত

আনুমানিক দশঅম শতাব্দীর ধর্মঙ্গল মহাকাব্যের লাউসেনের কিংবদন্তী রাজধানী হল ময়নাগড়। গৌড়েশ্বর ধর্মপালের রাজত্বকালে কর্ণসেন তাঁর অধীনে রাজত্ব করতেন। ইছাই ঘোষের সঙ্গে যুদ্ধে কর্ণসেন তাঁর ছয় পুত্রকে হারান। তাঁর স্ত্রী বিষপানে দেহত্যাগ করেন। তখন গৌড়েশ্বর ধর্মপাল নিজের শ্যালিকা রঞ্জাবতীর সঙ্গে কর্ণসেনের বিয়ে দেন। কর্ণসেনকে দক্ষিণবঙ্গের একটি বিশেষ অঞ্চল দান করেন। এটি কর্ণগড় নামে খ্যাত। এই কর্ণগড়ই পরে ময়নাগড় নামে প্রসিদ্ধ হয়। এই রঞ্জাবতীর ছেলে ছিল লাউসেন। এই লাউসেনের কিংবদন্তী রাজধানী হল ময়নাগড়। পরবর্তী কালে  বাহুবলীন্দ্র রাজারা বালিসীতাগড় থেকে নিজেদের রাজধানী ময়নাগড়ে স্থানান্তরিত করেন। কালিদহ ও মাকড়দহ নামে দুটি পরীখা দিয়ে ঘেরা এই ছোট্ট দ্বীপ ময়নাগড়। দ্বীপটি ছিল দুর্ভেদ্য দুর্গ। চারিদিকে ঘেরা ছিল কাঁটাবাঁশ ঝাড়ের দুর্ভেদ্য প্রাকৃতিক প্রাচীর।

রাজা গোবর্ধনানন্দ ময়নাগড় অধিকার করে সংস্কারের কাজ করেন। তিনি পুরাতন গড় ভেঙে নতুন ও প্রসস্থ গড় নির্মান করেন। গড়ের চারিদিকে পরীখার পার্শে পার্বত্য বাঁশের ঝাড় ঝাড় তৈরি করে দুর্ভেদ্য এক প্রাকৃতিক প্রাচীর তৈরি করেন। এই পার্বত্য বাঁশের ঝাড় এমন ভাবে পরস্পর সংলগ্ন ও জড়িয়ে থাকত যে তা এক নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরী করত। এই প্রাচীর ভেদ করে লৌহ নির্মিত তীর বা কামানের গোলাও যেতে পারত না। শত্রুপক্ষের অশ্বারোহী সৈনিকও এই প্রাচীর ভেদ করে ঢুকতে পারত না। ১৩৩৯ সালের ভয়ংকর ঝড়ে এই বাঁশঝাড়ের প্রাচীরের প্রভূত ক্ষতিসাধন হয়। বর্তমানে এই বাঁশঝাড়ের বিচ্ছিন্ন কিছু অস্তিত্ব রয়েছে।

তথ্যসূত্র

কিল্লা ময়নাচৌরা, ড. কৌশিক বাহুবলীন্দ্র

ধর্মমঙ্গল কাব্যের কিংবদন্তী লাউসেনের ময়নাগড়ের কদমা ও থালা বাতাসা

 ময়নাগড়ের কদমা ও থালা বাতাসা

রূপেশ কুমার সামন্ত

আনুমানিক দশম শতাব্দীর ধর্মঙ্গল মহাকাব্যের লাউসেনের কিংবদন্তী রাজধানী হল ময়নাগড়। গৌড়েশ্বর ধর্মপালের রাজত্বকালে কর্ণসেন তাঁর অধীনে রাজত্ব করতেন। ইছাই ঘোষের সঙ্গে যুদ্ধে কর্ণসেন তাঁর ছয় পুত্রকে হারান। তাঁর স্ত্রী বিষপানে দেহত্যাগ করেন। তখন গৌড়েশ্বর ধর্মপাল নিজের শ্যালিকা রঞ্জাবতীর সঙ্গে কর্ণসেনের বিয়ে দেন। কর্ণসেনকে দক্ষিণবঙ্গের একটি বিশেষ অঞ্চল দান করেন। এটি কর্ণগড় নামে খ্যাত। এই কর্ণগড়ই পরে ময়নাগড় নামে প্রসিদ্ধ হয়। এই রঞ্জাবতীর ছেলে ছিল লাউসেন। এই লাউসেনের কিংবদন্তী রাজধানী হল ময়নাগড়। পরবর্তী কালে  বাহুবলীন্দ্র রাজারা বালিসীতাগড় থেকে নিজেদের রাজধানী ময়নাগড়ে স্থানান্তরিত করেন। কালিদহ ও মাকড়দহ নামে দুটি পরীখা দিয়ে ঘেরা এই ছোট্ট দ্বীপ ময়নাগড়। দ্বীপটি ছিল দুর্ভেদ্য দুর্গ। চারিদিকে ঘেরা ছিল পার্বত্য গুলিবাঁশের ঝাড়ের দুর্ভেদ্য প্রাকৃতিক প্রাচীর।

এখানে প্রতিবছর রাসপূর্ণিমায় শুরু হয় বিখ্যাত রাসমেলা। এই মেলার মুখ্য আকর্ষণ হল থালা বাতাসা ও কদমা। এই বাতাসা গুলি থালার মতো বড় বড় সাইজের হয়। আর কদমা গুলি বড় বলের ন্যায়। উপকরণ হিসাবে লেবু ও চিনির রস দ্বারা প্রস্তুত 'গাবী'র সঙ্গে হাইড্রো নামক পাউডার অনেকটাই মেশানো হয়। এজন্য এগুলো হালকা, নরম ও সাদা হয়। তবে কদমাতে শুধুমাত্র গাবী মেশানো হয়। পাউডার মেশানো হয় না। কদমা গোল ও কুমড়োর মতো শিরাবিন্যাস যুক্ত হয়। কদম ফুলের মতো দেখতে হওয়ার কারনে এর নাম কদমা। এক একটি কদমার ওজন দেড় থেকে দুই কেজি পর্যন্ত হয়। আর এক একটি থালা বাতাসার ওজন দুই থেকে আড়াই কেজি পর্যন্ত হয়।

তথ্যসূত্র

কিল্লা ময়নাচৌরা, সম্পাদনা . কৌশিক বাহুবলীন্দ্র

ধর্মমঙ্গল কাব্যের কিংবদন্তী লাউসেনের ময়নাগড়ের রাসমেলা

 ময়নাগড়ের রাসমেলা

রূপেশ কুমার সামন্ত

আনুমানিক দশম শতাব্দীর ধর্মঙ্গল মহাকাব্যের লাউসেনের কিংবদন্তী রাজধানী হল ময়নাগড়। গৌড়েশ্বর ধর্মপালের রাজত্বকালে কর্ণসেন তাঁর অধীনে রাজত্ব করতেন। ইছাই ঘোষের সঙ্গে যুদ্ধে কর্ণসেন তাঁর ছয় পুত্রকে হারান। তাঁর স্ত্রী বিষপানে দেহত্যাগ করেন। তখন গৌড়েশ্বর ধর্মপাল নিজের শ্যালিকা রঞ্জাবতীর সঙ্গে কর্ণসেনের বিয়ে দেন। কর্ণসেনকে দক্ষিণবঙ্গের একটি বিশেষ অঞ্চল দান করেন। এটি কর্ণগড় নামে খ্যাত। এই কর্ণগড়ই পরে ময়নাগড় নামে প্রসিদ্ধ হয়। এই রঞ্জাবতীর ছেলে ছিল লাউসেন। এই লাউসেনের কিংবদন্তী রাজধানী হল ময়নাগড়। পরবর্তী কালে  বাহুবলীন্দ্র রাজারা বালিসীতাগড় থেকে নিজেদের রাজধানী ময়নাগড়ে স্থানান্তরিত করেন। কালিদহ ও মাকড়দহ নামে দুটি পরীখা দিয়ে ঘেরা এই ছোট্ট দ্বীপ ময়নাগড়। দ্বীপটি ছিল দুর্ভেদ্য দুর্গ। চারিদিকে ঘেরা ছিল কাঁটাবাঁশ ঝাড়ের দুর্ভেদ্য প্রাকৃতিক প্রাচীর।

  • ১৯৬৬ সাল থেকে বিশেষ সান্ধ্য রাস বা নৈশকালীন বিহার চালু হয়। রাস পূর্ণিমার সন্ধায় শ্যামসুন্দর জিউ দুই রাধিকাকে সঙ্গী করে পরীখার রাজঘাট থেকে নৌকাবিহার করেন। জমকালো সাজানো নৌকায় এই বিহারযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। পরীখার জ্যোতস্নালোকিত শান্ত জলে ভেসে বেড়ান শ্যামসুন্দর।  আতসবাজি আর আলীর বন্যায় চারিদিক ভেসে যায়। বেজে ওঠে শঙ্খ, কাঁসর, ঘন্টা, ঢাক, ঢোল, মৃদঙ্গ, খোল, করতাল। উৎসবের আবেশে রাস পুর্নিমা থেকে শুরু হয় রাসমেলা। লক্ষ মানুষের ভিড়ে সেই মেলা আজও তার ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।
তথ্যসূত্র
কিল্লা ময়নাচৌরা, সম্পাদনা ড. কৌশিক বাহুবলীন্দ্র

Monday, 25 November 2024

পাঁশকুড়ার গোটপোতার বিস্ময়কর সেতু

 

পাঁশকুড়ার গোটপোতার বিস্ময়কর সেতু

© রূপেশ সামন্ত

পাঁশকুড়া ব্লকের ঘোষপুর অঞ্চলের গোটপোতা গ্রামে রয়েছে এক বিস্ময়কর সেতু। এখানে ক্ষীরাই নদী এবং মেদিনীপুর ক্যানেল একে অপরের উপর দিয়ে প্রবহমান। কোন প্রবাহই কাউকে স্পর্শ করে না। দুটি জলপ্রবাহই স্বতন্ত্র ভাবে যুক্ত চিহ্নের মতো একে অপরকে অতিক্রম করে চলে গেছে। এটি ব্রিটিশ আমলের কারিগরি বিদ্যার অন্যতম নজির। মেদিনীপুর ক্যনেলের জলস্তর ক্ষীরাইয়ের জলস্তরের থেকে উঁচু। তাই ক্ষীরাইকে আড়াআড়ি ভাবে অতিক্রম করার সময় যাতে মেদিনীপুর ক্যানেলের সব জল ক্ষীরাইয়ে না চলে যায় এবং ক্যানেলের জলস্তর যাতে দুইদিকে সারাবছর ঠিক থাকে, তাই এখানে বিশেষ এই কারিগরী বিদ্যার প্রয়োগ করা হয়েছে। এখানে একটি সেতুর সাহায্যে যুক্ত চিহ্নের ন্যায় আড়াআড়ি দুটি প্রবাহকে সম্পূর্ণ আলাদা করা হয়েছে। সেতুর উপর দিয়ে মেদিনীপুর ক্যানেল গিয়েছে এবং সেতুর নিচ দিয়ে ক্ষীরাই নদীকে প্রবাহিত করা হয়েছে। ক্ষীরাই নদীর উপর ১০টি খিলানের সাহায্যে সেতুটি তৈরি করা হয়েছে। এক সময় খড়্গপুর আই.আই.টি-র ছাত্র-অধ্যাপকরা এই বিস্ময়কর স্থাপত্য পরিদর্শনে নিয়মিত আসতেন। সেতুর উপর দিয়ে প্রবাহিত মেদিনীপুর ক্যানেল দিয়ে তৎকালীন সময়ে অনায়াসে নৌকা, ষ্টীমার যাতায়াত করত। আর ক্ষীরাইয়ের জল যখন শুকিয়ে যেত তখন ক্যানেলের নিচ দিয়ে মানুষ ও গরুর গাড়ি যাতায়াত করত।

মেদিনীপুর ক্যানেল জলপথের অতীত কথা

 

মেদিনীপুর ক্যানেল জলপথের অতীত কথা

রূপেশ কুমার সামন্ত

অতীতে পাঁশকুড়ায় জলপথের গূরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল কাঁসাই, ক্ষীরাই, বাকসী প্রভৃতি নদী ও খাল। এইসব জলপথে নৌকা, যন্ত্রচালিত নৌকা ইত্যাদি চলাচল করত। মূলত বর্ষাকালে বা জোয়ারের সময় মানুষ পরিবহনের কাজ বেশি করে করত। তখন স্থলপথে পরিবহন অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল ছিল। আজ থেকে কুড়ি বছর আগে পর্যন্তও নৌকা বা যন্ত্রচালিত নৌকায় মাল পরিবহন করতে দেখা গেছে। শুধু নৌকা নয়, নদীপথে শ’য়ে শ’য়ে বাঁশ বা কাঠ ভাসিয়ে দিয়ে স্রোতের টানেও পরিবহন হত। এমনকি বিয়ে বাড়ির বরযাত্রী বা কন্যাযাত্রী পরিবহনেও বন্যার সময় জলভরা মাঠের মধ্য দিয়ে, নদী-খাল দিয়ে নৌকা বা যন্ত্রচালিত নৌকা ব্যবহৃত হত। কলাগাছের ভেলা তৈরি করে মানুষ নদী-খাল পারাপার বা মৎস শিকার করত। পরবর্তীতে বন্যা প্রতিরোধী ব্যবস্থা গড়ে উঠলে, নদী-খালের নাব্যতা কমে গেলে, স্থলপথ যোগাযোগ উন্নত হলে, নদী-খালে ব্রীজ তৈরি হয়ে গেলে জলপথ যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্রমশ গূরুত্ব হারায়।

     হাওড়া বা কলকাতা যাতায়াতের জন্য স্থলপথে যানবাহন পাওয়া দূরুহ ছিল। এছাড়াও কাঁসাইয়ের জলপথে যাতায়াতের জন্য দূরত্ব অনেক বেশি ছিল। ফলে মেদিনীপুর থেকে হাওড়ার সাঁকরাইল পর্যন্ত নৌ চলাচলের জন্য ব্রিটিশরা একটি খাল খননের পরিকল্পনা করে। এই কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয় ‘ইষ্ট ইণ্ডিয়া ইরিগেশন এণ্ড ক্যানেল কোম্পানি’কে। এই ক্যানেলের নামকরন হয় মেদিনীপুর ক্যানেল। এই ক্যানেলের খনন কার্য শুরু হয়েছিল ১৮৬৬ সালে এবং শেষ হয় ১৮৬৮ সালে। এছাড়াও ক্যানেল থেকে সেচ কার্য শুরু হয় ১৮৭১ সালে। L.S.S. O’Malley তাঁর ‘Bengal District Gazetteers- Midnapore’ এ লিখেছেন, ‘The construction of the Midnapore canal was begun by the East India Irrigation and Canal Company in 1866; the works were taken over by the Government two years later, and irrigation commenced in 1871.’ ক্যানেলের জল সরবরাহের উৎস মোহনপুরের কাছে কংসাবতী নদী। ক্যানেলটি মোহনপুর থেকে উলুবেড়িয়ার কাছে হুগলী নদী পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। প্রবাহপথের মাঝে পাঁশকুড়ার কাছে কংসাবতী নদী, কোলাঘাটের কাছে রূপনারায়ণ নদী ও হাওড়া জেলার দামোদর নদী অতিক্রম করে হুগলী নদীতে পড়েছে। উল্লেখ্য, এই প্রকল্পটি প্রকৃতপক্ষে ‘ওড়িশা ক্যানেল প্রকল্পের’ অধীন ছিল। কলকাতা ও কটকের মধ্যে একটি নতুন জলপথ তৈরির জন্য প্রকল্পটি তৈরি গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে এটি পূর্বতন মেদিনীপুর জেলার আলাদা একটি প্রকল্প হিসাবেই রূপায়িত হয়।

     যাইহীক, ১৮৭৩ সালে কোম্পানি জলপথে ব্যবসা শুরু করে। লঞ্চ পরিষেবা শুরু হয়। মাল ও যাত্রী পরিবহন শুরু হয়। পুরানো পাঁশকুড়ায় থানার কাছে একটি লকগেট তৈরি হয়। ঐ লকগেট জলপথ-ষ্টেশন রূপে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। পাঁশকুড়ার যাত্রী ও পন্য ওখানেই ওঠানামা করত। পাঁশকুড়া থানার কাছে কাঁসাই পাড়ে স্থিত নোঙরের শিকল বাঁধার একটি স্থম্ভ তারই সাক্ষ্য বহন করে। ইন্দুমতী দেবী (জন্ম-১৮৮৮) তাঁর ‘স্মৃতিকনা’ গ্রন্থে লিখেছেন,-‘রেল চালু হবার আগে, মেদিনীপুর ক্যানেল দিয়ে ছোট স্টীমার চড়ে কলকাতা যেতে হত। পাঁশকুড়া বাজারে ষ্টীমারে উঠতে হত। সকালে রওয়ানা হয়ে কলকাতা পৌঁছতে বিকাল গড়িয়ে যেত’। কাঁটাপুকুরের কাছে রূপনারায়ন নদী চওড়া হয়ে যাওয়ার ফলে নৌযান চলাচলে সমস্যা তৈরি হতে থাকে। এরপর রেল পরিষেবা শুরু হওয়ার পর জলপথের গূরুত্ব কমতে থাকে। তখন ১৯০৬ সালে ক্যানেল কোম্পানি জলযানের মাশুল অর্ধেক করে দেয়। এরপর যাতায়াত কিছুটা বৃদ্ধি পায়। উল্লেখ্য, কংসাবতী ও মেদিনীপুর ক্যানেলে তৎকালীন উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ছাড়াও ঘাটাল-কোলাঘাট-তমলুক স্টীমার সার্ভিস চালু ছিল। ক্যালকাটা স্টিম নেভিগেশন কোম্পানির এজেন্ট হোরমিলার কোম্পানি এই সার্ভিস চালু করেছিল। স্টীমারগুলি ছিল দোতলা এবং এগুলিতে দুটি করে চোঙ থাকত। স্টীমার গুলি চলতো রূপনারায়ণ নদীতে। স্টীমার থামত দেনান ষ্টেশনে। স্টীমার গুলির নাম ছিল ‘ষোড়শী’, ‘শীতলা’, ‘কিন্নরী’, ‘উর্বশী’, ‘সুকেশী’ ইত্যাদি।

বাংলাদেশের ভারত বিরোধিতা: আবেগ না রাষ্ট্রবুদ্ধি?

বাংলাদেশের ভারত বিরোধিতা: আবেগ না রাষ্ট্রবুদ্ধি? ✍️ রূপেশ কুমার সামন্ত  বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে সাম্প্রতিক কালে ভা...